অবাধ্য ধর্ষণ : স্বপ্নে পূর্ণার ছিন্নভিন্ন দেহটি ভেসে উঠে

ধর্ষণ আজকাল আর ভাবায় না- ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। স্ত্রীলিঙ্গ নিয়ে জন্ম নিবে আর ‘ধর্ষণ’ হবে না তা আবার কেমন কথা! তার মধ্যে স্ত্রীলিঙ্গ নিয়ে জন্ম নেওয়া নারী ও শিশুটি যদি হয় দুর্বলচিত্তের- তার শ্রেণীগত অবস্থান যদি হয় শোষিতশ্রেণী। তাহলে তো আর কথাই থাকে না!

আবার যদি হয় অন্য জাতিগোষ্ঠির! সবই সম্ভব তো এই রাষ্ট্রে। নতুন কিছু না তো, সবই পুরাতন কাহিনী। আমরা বোকারাই ভাবি, কষ্ট পাই, দুঃখ পাই- অগোচরে দু’ফোটা চোখের জলও ফেলি। খাবার মুখে দিতে গিয়ে ওই ‘ধর্ষিতা’দের ছবি চোখেও ভেসে উঠে, ভেসে উঠে পূর্ণার ছিন্নভিন্ন দেহটি। নিজেকে ভাবতে চাই পূর্ণার জায়গায়, নিজের আত্মীয়-পরিজনকে ভাবতে চাই, নিজের ভবিষ্যৎ কন্যা শিশুটিকে এ দেশেই জন্ম দিতে হবে ভাবতেই গা আঁতকে উঠে- না! না! না! বলে চিৎকার করে উঠতে গিয়ে থেমে যাই- কোথায় যেন ভয়, কি যেন হারানোর ভয়! যাক্, ভালোই তো আছি মন্দ কী বলে- থেমে যাই!

গভীর ঘুমে যখন আচ্ছন্ন তখন স্বপ্নে পূর্ণার ছিন্নভিন্ন দেহটি ভেসে উঠে। পূর্ণাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে, পূর্ণার হাতদুটো ভেঙ্গে দিয়েছে, পূর্ণার যোনিকে ছিন্নভিন্ন করেছে, পূর্ণার পায়ুপথে গাছের গুড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছে- কি বিবরণ! সবই ভেসে উঠে চোখের সামনে! আবার চেতনায় আয়নায় ভেসে উঠে নিজেদের ব্যর্থতা, নিজেদের সুবিধাবাদিতা, লেজুড়বৃত্তিতা, ক্ষমতালোভীদের চিত্র! সবই তো ঘটছে কোনটাকে রেখে কোনটাকে বেছে নিবো-আত্মদহনেও ভুগি! কাদের কাছে কি আশা করবো, প্রত্যাশা করবো! এত এত মানুষের মধ্যে কতজন‘মনুষ্যত্ববোধ’কে অর্জন করতে পেরেছে? পূর্ণাদের জন্য কতজনের মন কাঁদে, ঘুম হয় না?

আচ্ছা, মাননীয়া আপনি দেশের চিন্তায় মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমান। আমরা তা অবিশ্বাস করতে চাই না- আপনার কি পূর্ণার কথা একবারও মনে হয়নি, পূর্ণার বিবরণ পড়তে ইচ্ছে করেনি- পূর্ণাকে মেরে ফেলার পিছনে কি কারণ তা জানার ইচ্ছে জাগেনি? কেন জাগেনি? আপনি তো মহান, মানবতার প্রতীক? আপনার মানবতা তবে কাদের জন্য- এ প্রশ্ন করা কি আজ অপ্রাসঙ্গিক বা অনুচিত?

জানুয়ারি ২০১৪ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ২৮৯ টি রেপ কেস রেকর্ড করা হয়েছে সারাদেশে।এটা রেকর্ড করা, রেকর্ডেও বাহিওে আরো কত আছে তা তো আমরা জানি না! তবে এটুকু নিশ্চিত হতেই পারি যে, রেকর্ডেও বাহিরেও থাকে! ভিকটিমদের মধ্যে নারী ১৩ হাজার ৮৬১ এবং শিশু ৩,৫২৮ জন। সংবিধান অনুযায়ী এই ৩,৫২৮ জনশিশু, এদেও বয়স আঠারো বয়সের নিচে। কিন্তু এরা স্ত্রীলিঙ্গ। এই স্ত্রীলিঙ্গ নিয়ে পৃথিবীতে আসার কারণেই এরা ধর্ষণের শিকার হবে, এটা কি মেনে নিবো, মানিয়ে নিবো?

না মানিয়ে নিবো না! এজন্যই বলতে চাই, দৃঢ়ভাবে বলতে চাই এই রাষ্ট্র আমাদের না একটা শ্রেণীর, একটা গোষ্ঠীর। যে গোষ্ঠীটাকে পরিচালনা করে এই রাষ্ট্রযন্ত্র। যে রাষ্ট্রযন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছি আমরা। হ্যাঁ, আমাদের টাকা দিয়েই তারা চলে- জনগণের টাকা। তবে কেন আমরা মানিয়ে নিবো? আমাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত কেন জাগবে না! আমি বাংলাদেশী, আমি বাংলাভাষাকে ভালোবাসি, আমি বাঙালি-একথাগুলো বলতে আজ বড় লজ্জা লাগে। আমার ত্রিপুরা কন্যার লাশের দিকে আমি তাকাতে পারিনা, তাকে ছিন্নভিন্ন করার বিবরণ আমি পড়তে পারি না- স্তব্ধ হয়ে যাই, নির্বাক হয়ে যাই! ফুঁসে উঠি, আমাকে থামিয়ে দেওয়া হয়।

আমিও ভয় পাই- এ জল্লাদদেরকে। আমিও মেনে চলি এদেরকে! আজ গণতন্ত্রকে এরাই গণধর্ষণ করছে। এটা বুঝেও আমরা চুপ থাকছি! আমাদের ক্ষমতার লোভে পেয়ে বসছে, আমাদের মেরুদ- আজ কিনে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে শাসকগোষ্ঠি, আমরা সেই ফাঁদে পা দিয়ে বসে আছি। যার ভয়ালথাবা পরছে পূর্ণাদের উপর, দুর্বলদের উপর। যে শ্রেণীটাকে আমাদের ভালোবাসার কথা সেই শ্রেণীটার প্রতি আমাদের কোনো ভালোবাসা আজ আর অবশিষ্ট নেই। যদি অবশিষ্ট থাকতো তবে একের পর এক ঘটনা ঘটতেই থাকতো না।

আমরা শপথ নিতে পারি না, আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি না- আর একটি পূর্ণাকে ধর্ষণ করলে, হত্যা করলে আমরা ছাড়বো না বন্য জানোয়াদেরকে। পূর্ণার কথা যতবার ভাবছি ততবারই মনে হচ্ছে আমিও ‘মা’ হবো, স্বপ্ন দেখি। আমার কন্যা সন্তানটিকে এই বাংলাদেশেই বড় করবো, স্কুলে পাঠাবো- ভাবতেই থমকে যাই! এই থমকে যাওয়া থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতে হবে। যে আগুনে জ্বলে পুড়ে ছারখার হবে ধর্ষকরাষ্ট্র, ধর্ষক পোষণকারীরা, ধর্ষকরা। এই পৃথিবীটা একদিন মানবিক পৃথিবী হবে, যে পৃথিবীতে ছোট-বড়-ধনী-গরিব শ্রেণীবৈষম্য থাকবে না এই স্বপ্নও আমরা দেখতে পারি/দেখাতে চাই। যেজন্য প্রকৃতপক্ষে বিপ্লবী পার্টিতে সামিল হওয়ার আহ্বানও জানাই। মেরুদ- বিক্রি করে দেওয়া, ক্ষমতালোভী, ব্যক্তিস্বার্থপরদের ঘৃণা করি। এই রাষ্ট্রের সকল নরপিশাচদের থু থু দেই। পৃথিবীটাকে মানবিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। পূর্ণাদের আবাসস্থল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। সকল পূর্ণাদের জন্য নতুন পৃথিবী গড়ে উঠুক সেই প্রত্যাশাও করি।

হতাশার গ্লানি আমাকে স্পর্শ না করুক, ক্ষণিকের আবেগ অগ্নিশিখায় পরিণত হোক। পাহাড়ী বন্ধুদের প্রতি অনুরোধ আপনার যেমন জীবন সংগ্রামে জয়ী তেমনই প্রতিরোধে, প্রতিবাদেও জয়ী হন। এই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে আঙ্গুল তোলেন। ধর্ষণ হওয়ার কারণ কি কি তা উদঘাটন করুন, ধর্ষণকামী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিন। সকল শোষিত-নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের হোক একই প্রত্যয়।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার লাবণী মন্ডল

মূলত নারী, প্রাণ, প্রকৃতি, রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করি। কমিউনিস্ট মতাদর্শ ধারণ করি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।