আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ‘গরিব-মিসকিন’রা

()
  • করোনা মহামারিতে সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত। নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পেরিয়ে এখন মধ্যবিত্তের জীবনে টানাপোড়ন চলছে। স্বল্প আয়ের মানুষ পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে ঢাকার বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন। কতদিন পারে একমাস, দুইমাস, তিনমাস! ছয়মাসেও তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর জীবন, জীবিকা ও আয় স্বাভাবিক করার লড়াই আরও দীর্ঘ হবে কোন সন্দেহ নেই।
১৮ মার্চ থেকে বিশ^বিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে ছুটি ও হল ভ্যাকেন্ট ঘোষণা করা হয়। ১৪ দিনের ছুটি তিনমাস পার হতে চলেছে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই স্বল্প ছুটির প্রস্তুতিতে  গ্রামে চলে গেছে।
আমাদের দেশের পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের হলে সিট সমস্যা প্রকট। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী হলে না থাকার পরও মাস্টার্সের আগে সিঙ্গেল সিট পাওয়া পরম ভাগ্যের ব্যাপার। জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে ভিত্তি প্রস্তরের ৮ বছরেও হল নির্মাণ শেষ হয়না। ফলে উচ্চভাড়ার মেসই শিক্ষার্থীর মাথা গোঁজার আশ্রয়। দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা বেশ উন্নত নয়। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে পড়–য়া শিক্ষার্থীদের বেশীর ভাগই নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। এই আর্থিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ টিউশনি করে নিজের খরচ চালায়। অনেকে আছে যাদেরকে এই  টিউশনির আয়ের একটি অংশ পরিবারের অন্ন যোগানে পাঠাতে হয়। আমাদের দেশের দূর্ভাগ্য টিউশনি ছাড়া শিক্ষার্থী অবস্থায় আয়ের তেমন কোন পথ তৈরী হয়নি দেশে। করোনা মহামারির ফলে স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ ও চলমান লকডাউনের ফলে শিক্ষার্থীদের আয়ের সেই টিউশনও বন্ধ। তাছাড়া প্রায় সবার পারিবারিক আয়েও টানাপোড়ন। অনেক শিক্ষার্থীদের পরিবার খাবারের টাকা যোগাড় করতে পারছে না। এমন আর্থিক দূরবস্থায় পড়া অনেক পরিবারকে শিক্ষার্থীরাই সহযোগিতা করেছে। যাই হোক এভাবে মাসের পর মাস আয় বন্ধ, টিউশন বন্ধের ফলে খালি পড়ে থাকা মেসে উচ্চ  ভাড়া পরিশোধ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি বাড়িওয়ালা ভাড়া চায় অন্যদিকে পরিবারের এমন অবস্থা টাকার কথা বলবে এমন পরিস্থিতি নেই। দেশ-বিদেশের সব শ্রেণির মানুষের আয়ে প্রভাব ফেলেছে করোনা মহামারি। ফলে শিক্ষার্থীরা আর্থিক সংকটে পড়া স্বাভাবিক।
এমন পরিস্থিতিতে জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেস ভাড়া দিতে না পেরে সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ^বিদ্যালয়ের অভিভাবক উপাচার্য অধ্যাপক ড.মীজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করেন। মেস ভাড়া দিতে না পারার কথা শুনে তিনি বলেন, ‘আমি মনে হয় সব থেকে গরিবের বাচ্চাদের নিয়ে এসে ভর্তি করেছি। তোমরা এত মিসকিন, নিজেদের আত্মমর্যাদা পর্যন্ত নেই। তোমাদের বিয়ে হবে না। বিয়ে করতে গেলে বলবে,গরিবের বাচ্চা সব তোমরা।  আমি কি বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম যে,দরিদ্রদের ভর্তি করা হয়। এটা কি দরিদ্রদের এতিমখানা, মাদ্রাসা? বিড়ি-সিগারেট, বিরিয়ানি, আইসক্রিম, রিক্সা ভাড়া,বান্ধবীরে খাওয়ানো লাগতেছে না। এসব টাকা দিয়ে বাড়ি ভাড়া দিচ্ছো না কেন!’
একটি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য ও শব্দচয়ন দেশ ও জাতিকে হতাশ করে। বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকরা জাতির দর্পণ স্বরুপ। একটি জাতি গঠনে ও সমাজ ব্যবস্থার মূল্যবোধ গঠনে তাদের দায়িত্ব অনেক। অথচ এই বক্তব্য প্রমাণ করে বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কত নিম্নমানের চিন্তাভাবনাকে ধারণ করে বসে আছেন।
উপাচার্য মহোদয় টিভি টকশো করে বেড়ান। দেশ-বিদেশের খবরাখবর থাকার কথা। তাঁর জানা থাকার কথা সারাদেশ কার্যত লকডাউন। মানুষের আয় নেই, পেটের ভাত মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেছেন বিড়ি-সিগারেট, রিক্সা ভাড়া ও আইসক্রিমের বিল থেকে মেস ভাড়া দিতে। তিনি জানেন না বিড়ি আইসক্রিম নয় মানুষের পেটে ভাত যোগাতে, হাসপাতালে অক্সিজেন যোগাতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেশবাসীর। তিনি  তিনি নিজে বেতন পাচ্ছেন বলে হয়ত ভুলে গেছেন দেশের বেসরকারী চাকুরি জীবিদের অনেকেই বেতন পাচ্ছেন না, ভাসমান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ির ব্যবসা বন্ধ।
উপাচার্য মহোদয় জানতে চেয়েছেন তিনি বিজ্ঞাপন দিয়ে দরিদ্রদের ভর্তি করিয়েছেন কিনা! তিনি তো ধনীদের ভর্তি করোনার বিজ্ঞাপনও দেননি। দেশের ৬৪ জেলার নানা ধর্ম, শ্রেণি, পেশার মানুষের সন্তান বিশ^বিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হয়। এই বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি অবগত নন হয়ত। তিনি হয়ত জানেন মাঠের ধান ঘরে উঠলে তবে অনেক পরিবারে অন্ন মিলে। শহুরে বুদ্ধিজীবি মার্কা এলিট আয়ের পরিবারের সন্তান নই আমরা। আমাদের বাবাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা টাকা, আমাদের মায়েদের সবজি বেচা, মুরগীর ডিম বেচা টাকা দিয়ে আমাদের খাতা-কলম কিনতে হয়। তিনি জানতে চেয়েছেন জবি কোন মাদ্রাসা কিনা! এর মাধ্যমে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। মাদ্রাসাফোবিয়াকে উস্কে দিয়েছেন। তিনি আর্থিক সংকটাপন্ন পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন মাদ্রাসার সাথে। উপাচার্য মহোদয়ের এমন বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি একজন বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের সাথে তার যোজন মাইল দূরত্ব। আমাদের উপাচার্যদের এমন দূরত্ব এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন তাচ্ছিল্য করা নতুন নয়। হারহামেশায় আমাদের শিক্ষকরা পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে টাকা ছাড়া পড়া, বিভাগ উন্নয়ন ফি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের কটুকথা বলেন। বিদেশে টাকা ছাড়া শিক্ষা মেলেনা বলে সতর্ক করেন। অথচ তারাও সেই গ্রাম থেকে বাবাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শ্রমের টাকা, ধানবেচা টাকা দিয়ে পড়াশোনা করে শিক্ষক হয়েছেন। তারা আজকে শিক্ষার বিনিময়ে পয়সা খরচ করতে হবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দেন।
জবি উপাচার্যের বক্তব্য এটা স্পষ্ট করে শিক্ষার্থীদের মেস ভাড়া সংকটে তিনি কার্যত কিছু করবেন না। শহরে গজিয়ে উঠা উচ্চবিত্ত শ্রেণি, কৃষকের সন্তান থেকে এলিট হওয়া শ্রেণি, জনবিচ্ছিন্ন শহুরে বুদ্ধিজীবি শ্রেণির আমাদেরকে ‘গরিব-মিসকিন’ বলে তুচ্ছ- তাচ্ছিল্যের মধ্যেই আমাদের বাঁচার লড়াইটা করতে হবে। তবে উপাচার্য মহোদয়ের প্রতি অনুরোধ তিনি যেন ভবিষ্যতে শুধু এমন শিক্ষার্থীদের বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি বিজ্ঞাপন দেন পৃথিবীর মহামারির ফলে মাসের পর মাস অর্থনীতির চাকা বন্ধ থাকলেও যাদের কোন আর্থিক সংকট তৈরী হবেনা। ‘গরিবের বাচ্চা’ হওয়ায় যাদের বিয়ে হবে না, ‘আত্মমর্যাদাহীন গরীব মিসকিন’দের দায়িত্ব নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বরং ধনীদের উপাচার্য হউক।
সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা প্রতিমাসে ১৫০০ টাকা সম্পূরক বৃত্তির দাবি জানিয়েছে। এই যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া উচিত হলেও তিনি কতটা আমলে নিবেন তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়।
#………
লেখক তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

একটি মন্তব্য

  1. আব্দুর রহিম রানা

    বেশ ভালো লিখেছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।