আমাদের অস্তিত্ব টিকে থাকবে কি, থাকবে না?

আমাদের জীবনধারণ পদ্ধতি বা জীবিকানির্বাহ পদ্ধতি এখনো ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন পদ্ধতি জুম চাষ উৎপাদনে ওপর নির্ভর অধিকাংশ। আর কিছু কিছু মানুষ ছোটখাট ফলমূল বাগান করে এবং ছোটখাট ফলমূলাদি আর শাক-সব্জি ব্যবসায় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। আর কিছু কিছু মানুষ কৃষিকাজ করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে চলছে। কিছু কিছু মানুষ চাকরি-বাকরি করে জীবনকে টিকিয়ে রাখে।

একজন জুমিয়া সকালে ঘুম থেকে উঠে জুমে যায় এবং সন্ধ্যা ফিরে আসে জুমের কাজকর্ম করে। ঘুমানোর আগে জুমের কথা চিন্তাভাবনা করে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে তার দৈনন্দিন জীবন জুমকে ঘিরে কাটে। যতদিন না পরিশ্রমে ফসল ঘরে তোলে। একজন কৃষক ও ঠিক তেমনি তার কৃষিকাজকে ঘিরে এভাবে কাটে। তাদের আশা দু’মুঠো ভাত খেয়ে সাধারণত বেঁচে থাকা। আসলে দু’মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকা কি প্রকৃতভাবে বেঁচে থাকা?

আমরা সকলে জানি, প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার পাঁচটি। যথা- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। এই পাঁচটি সুযোগ-সুবিধা পাবার সকলে অধিকার আছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, পাহাড়ে বসবাসরত আদিবাসী বা পাহাড়িরা কি সে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে? উত্তর হবে, না। সকলের সমানভাবে সে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থান এই তিনটি মূলত ভূমিকে ঘিরে। অথচ প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে আমাদের ভূমিগুলো কেড়ে নিচ্ছে বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে। কিভাবে আমাদের ভূমিগুলো কেড়ে নিচ্ছে বা বেদখল করে নিচ্ছে -সেটা আমাদের চারিপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট দেখতে পাই। ফলে দিন দিন আমাদের প্রয়োজন তুলনায় ভূমি কমে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে আমরা কিভাবে সে তিনটি মৌলিক অধিকার সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি? আর এভাবে যদি দিন দিন ভূমি সঙ্কটের মধ্যে কাটে আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটা নিশ্চয় সবারই জানা। সেটি সাথে প্রশ্ন থেকে যায়, কারা ভূমি বেদখল বা কেড়ে নিচ্ছে? এবং এর জন্য দায়ীকে?

বাজার দিন হলে দেখতে পাই, সে জুমিয়া, কৃষকরা দূর-দূরান্ত থেকে বাজারে আসার সময় কিছু জুমের ফলমূলাদি এবং শাক-সব্জি সঙ্গে করে নিয়ে আসে বাজারে বিক্রি উদ্দেশ্যে। সেগুলো কোন মোটা অঙ্কের লাভে আশা নয়। বিক্রি করে কিছু রান্না-বান্না করার মসলা-জাতীয় কেনার অথবা নৌকার ভাড়া টুকটাক। এখানে এসেও সে স্থানীয় কিছু সংখ্যক বাঙালির পাইকারি ব্যবসায়ী কাছে নায্যমূল্য বা পরিশ্রের ফল পাই না। কারন সে অশিক্ষিত এবং নায্যমূল্য পাবার যে অধিকার আছে – সেটা তার জ্ঞাত নয়। অর্থাৎ সিন্ডিকেট শিকার হয় প্রতিনিয়ত।

আর বাকি দু’টি শিক্ষা ও চিকিৎসা পাবার অধিকার নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ওপর। অর্থাৎ স্থানীয় সরকার বা প্রশাসন ব্যবস্থাপনার ওপর। দু’টি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হলেও বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতিনিয়ত একটি পরিবারকে তার ছেলে বা মেয়ে টিউশন ফি, কোচিং ফি এবং স্কুলের ফি নিয়ে চিন্তা করতে হয়। স্কুলের ক্লাস পাশাপাশি বাড়তি শিক্ষা গ্রহণের জন্য একজন ছাত্র-ছাত্রীকে বাড়তি টিউশন এবং কোচিং ব্যবস্থা করতে হয়। সেগুলোর জন্য আবার বাড়তি অর্থ ও প্রয়োজন। কিন্তু একজন দারিদ্র অভিভাবকের পক্ষে কি সম্ভব সেগুলো ব্যবস্থা করতে?
চারিদিকে যে সমস্যা মধ্যে ভুগছি সেটাকে কিভাবে বলতে পারবো যে, সুস্থভাবে বেঁচে আছি বা প্রকৃত জীবনযাপন করছি।

পাহাড়ে মানুষের জীবনধারণ পদ্ধতি চিত্রকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাবেন, বহুমুখীভাবে শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত, অত্যাচারিত। তাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্রতিটি ব্যবস্থাতে তাকে ঠকে যেতে হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসন ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক ও সামরিক শাসন ব্যবস্থা।

একদিকে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে যে আমাদের ভূমিগুলো বেদখল করে নিচ্ছে অপরদিকে নিরাপত্তাহীনতা ভুগছে আদিবাসী নারীরা। তাদেরকে পরিকল্পিত ভাবে প্রেমের গল্প সাজিয়ে বা প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্মান্তরিত করছে। রাজি না থাকলে ঘটছে ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা-খুন ইত্যাদি।

আমাদের চারিপাশে যে বহুমুখী সমস্যা হচ্ছে তা দেখে প্রশ্ন জাগে – আমাদের অস্তিত্ব টিকে থাকবে কি থাকবে না?

তাহলে এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, পাহাড়ে যে চারিদিকে সমস্যা হচ্ছে সেগুলো কি কোন একক জাতির তথা শুধু মারমা কিংবা শুধু ম্রো কিংবা শুধু চাকমা, ত্রিপুরা, খেয়াং সমস্যা নাকি পাহাড়ে সমগ্র আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহ সমস্যা? নিশ্চয় বলবে, পাহাড়ে সমগ্র পাহাড়ি জাতিরসমূহের সমস্যা। তাহলে এর সমাধান কিভাবে হতে পারে?

তার আগে দেখি আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো  কিংবা সমস্যাগুলো কি ধরনের সমস্যা? অর্থনৈতিক নাকি রাজনৈতিক সমস্যা? উত্তর হবে, রাজনৈতিক সমস্যা। তাহলে নিশ্চয় রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে।

রাজনৈতিকভাবে সমাধান লক্ষে বহু আলোচনার পর ১৯৯৭ সালে ২ রা ডিসেম্বর সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এখনো যথাযথভাবে চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়া ভূমি সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। ভূমি তো আমাদের অস্তিত্বের একটি অংশ।

এখন তাহলে করণীয় কি হতে পারে? পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন করা। এর ছাত্র সমাজ অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তা না হলে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার উথোয়াইনু মারমা

I'm student.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।