উঁ খিজারী : অবিভক্ত বাংলার অন্যতম শিক্ষানুরাগী ও দানবীর

()

খিজারীর জীবন

খিজারী’র জন্ম রামুর হাইটুপি মৌজায় লাওয়ের পাড়ায়। পিতার নাম ফাপ্রু সওদাগর। যদিও তাঁর মাতার নাম এখনো জানা যায়নি। তাঁর স্ত্রীর নাম ড মি চ্যান ম্রা [Daw Mi Chan Mra]। বড় ছেলে ক্যা যান হ্লা [Khyaw Zan Hla] এবং ছোট ছেলের নাম কিয়াও হটুন [Khyaw Htoon]। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে বড় ছেলের বয়স ছিলো ৩৫ বছর এবং ছোট ছেলের বয়স ১৮ বছর। কিয়াও হটুন তখন সেন্ট জেভিয়ার কলেজের জুনিয়র ক্যামব্রিজের ছাত্র। খিজারী’র জন্ম এবং মৃত্যু সাল নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট তর্ক বিতর্ক আছে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রামুর জন্মজাত এই মানুষটি নিজেকে কলকাতার অভিজাত শ্রেণীর একজন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে সময়ের সামাজিক বিভিন্ন কর্মকান্ডতো বটেই,এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কাজেও তাঁর বিচরণ চোখে পড়ার মতো। সেসময়ের সরকারি বিভিন্ন নথিতে,ধর্মীয় সাময়িকীতে,তাঁর নাম বিভিন্নভাবেই লেখা হতো। এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বোধিমিত্রের “স্বতন্ত্র সেনানী” বইতে। তাঁর নাম বিভিন্ন জায়গায় Moung Khee Zarhee, Khee Zarhee, U Kyi Zayi, Mr. Khee Za Rhee, Khee Jha Rhea, Khizaree, Khijari এবং Kheezarhee হিসেবে লেখা হয়।

ছবি: খিজারীর বাস্তব ছবি

বিগত ২০০৪ সালে রামু সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত “রম্যদর্পনে” “বাঁকখালি তীরের ক্ষণজন্মা গুনিজনেরা” নামক প্রবন্ধে লেখক এম সুলতান আহমদ মনিরী খিজারী’র জন্ম ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ এবং মৃত্যু ১৬ ই জুন ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ বলে উল্লেখ করেন।  তাছাড়া লেখক এবং গবেষক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বাবু ধনিরাম বড়ুয়া তাঁর লেখা “রামু’র প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহ্য” নামক বইটিতে খিজারীর জন্মসাল ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ উল্লেখ করেছেন। তবে পাঠকদের জানাতে চাই রামুর এই কৃতি সন্তান নিশ্চিতভাবেই ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কেননা,১৯৪৮ সালে The Maha Bodhi Society of Ceylon (এখনকার Sri Lanka) কর্তৃক প্রকাশিত Devapriya Valisinha কর্তৃক রচিত “Buddhist Shrines in India” গ্রন্থে ভারতের গোরকপুরে অবস্থিত কুশিনগরে (যেখানে গৌতম বুদ্ধ পরিনির্বাণ [গত হন] লাভ করেন) The Burmese Rest House টিকে “A gift of Late Mr. Khee Za Rhee” বলা হয়েছে। তারমানে দাঁড়ায় এই, দানবীর খিজারী ১৯৪৮ সালের আগে কোন এক সময়ে মারা যান।

ছবি: খিজারীর একটি ছবি যা আাঁকা হয়েছে

খিজারী ঠিক কত সাল থেকে নিয়মিতভাবে কলকাতায় থাকা শুরু করেন,তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল। তবে কলকাতায় তাঁর বাসস্থানের ঠিকানা সম্পর্কে মোটামুটিভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়। Bengal Buddhist Association এর বার্ষিক Report এ ১৯১৩-১৯১৪ সালের দিকে খিজারী 6, Champatola Lane,Calcutta তে থাকতেন বলে জানা যায়। এরপর ১৯১৬-১৯১৭ সালে একই প্রকাশনা মতে তিনি 6,Eden Hospital Road Ward No.8 এ চলে আসেন। Eden Hospital রোড এলাকাটিই কলকাতায় খিজারী’র স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠে। তবে বিভিন্ন সময় বাসা বদল করার তথ্য পাওয়া যায়। যেমন ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে Thacker’s Directory of India তে দেখা যাচ্ছে 6, Eden Hospital Road এর বাসাতে খিজারী’র বড় সন্তান Khyaw Zan Hla, Hla & Co. নামের একটি কোম্পানি চালু করেন,এবং খিজারী’র বাসাটি একই রোডের ৭ নম্বরে স্থানান্তরিত হয়। একই ডিরেক্টরি অনুসারে খিজারী পরে একই রোডের ৮ এবং সর্বশেষ ১০ নং বাড়িতে স্থায়ী হন। সম্ভবত মৃত্যু পর্যন্ত তিনি 10,Hospital Road বাড়িটিতেই ছিলেন। কেননা Maha Bodhi Journal এর বেশ কিছু সংখ্যায় সেই ঠিকানার কথাই বলা হয়েছে। এখানে একটু বলে রাখা উচিত বলে মনে করছি,10A,Eden Hospital Road ঠিকানায় খিজারীর সময় থেকেই একটি Burmese Buddhist Temple ছিলো, যা এখন মিয়ানমার টেম্পল নামে পরিচিত।সেখানে গেলে হয়তো খিজারী সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য পাওয়া যেতো।যাই হোক খিজারী’র বড় ছেলে Khyaw Zan Hla কলতাতার Weston Street এ তাঁর নতুন বাড়িতে থাকা শুরু করেন ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে,যার নাম ছিলো “খিজারী লজ”। সেই বাড়ির পাঠাগারটি নাকি দেখার মতো ছিলো। অনেক দুষ্প্রাপ্য বই ক্যা জান হ্লা’র সংগ্রহে ছিলো।

খিজারীর ব্যবসার বিবরণ ও অপঃপ্রচার

কলকাতায় যাওয়ার পর তিনি নিজেকে একজন রত্ন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯১০ সালে কলকাতার Maha Bodhi Society কর্তৃক প্রকাশিত জার্নালে খিজারীকে একজন Gem merchant বা রত্ন ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লখ করা হয়েছে। বোধিমিত্রের “স্বতন্ত্র সেনানী ” বইয়ে উনাকে একই ভাবে রত্ন ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লখ করা হয়েছে। ১৯১৭-১৯১৯ সালের Calcutta University Report এ দানবীর খিজারীকে “The leading merchant of Calcutta” বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯১৯ সালে Westminster Chambers, Victoria Street, London থেকে প্রকাশিত “The Asiatic Review” তে Calcutta University এর শিক্ষা প্রকল্প “Poverty Problem Study Fund” এ সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে অর্থ দানকৃত ব্যবসায়ীদের মধ্যে টাটা পরিবারের দোরাব টাটা’র (রতন টাটার পূর্বসূরি) পরের স্থানটি রামুর কৃতি সন্তান খিজারী’র ছিলো বলে উল্লেখ করা হয়। চট্রগ্রামের আরেক কৃতি সন্তান এবং ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের পুনঃজাগরণের অন্যতম নায়ক ভিক্ষু কৃপাশরণ মহাথেরো কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত “Bengal Buddhist Association” (যা পরে বৌদ্ধ ধর্মাংকুর সভা নামে পরিচিত হয়) এর ১৯১৩-১৯১৪ সালের কমিটিতে অনারেবল মেম্বারের তালিকায় খিজারী’র নাম দেখা যায়,যাতে খিজারীকে একজন “Banker” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যাই হোক,এটা নিশ্চিত যে খিজারী ১৯১৯ সাল নাগাদ কলকাতা শহরে নিজেকে একজন রত্ন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি যা করলেন তা সম্ভবত তাঁর ব্যবসায়ীক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং পতনও বটে।

স্বদেশী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। সারা ভারতবর্ষে স্বদেশী কারখানা গড়ে উঠতে লাগলো। বাংলা প্রদেশ কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিলো না।এখানেও গড়ে উঠতে লাগলো বড় বড় কারখানা এবং বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রামুর সন্তান উ খিজারী তৎকালীন ৫০,০০০০০/-(পঞ্চাশ লক্ষ টাকা) লগ্নী করে প্রতিষ্ঠা করলেন “খিজারী বার্মা টোবাকো লীফ লিমিটেড কোম্পানি “।Joint Stock Companies in British India এর ১৯২৩-১৯২৪ সালের Tenth Issue তে খিজারী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানটির কিছুটা বর্ণনা পাওয়া যায়।

Kheezarhee Burma Tobacco Leaf Limited Co.

Registered on 1th January 1920.

Authorised Capital Rs. 50,00000/-

Subscribed Capital Rs. 17,40,800/-

Paid up Capital Rs. 16,20,142/-

এই কোম্পানি বাজারে যে শেয়ার ছাড়ে তার মূল্য ছিলো প্রতিটা ১০/- টাকা । কলকাতায় কোম্পানির ঠিকানা ছিলো, 10,Eden Hospital Road,Calcutta, এবং বার্মায় কোম্পানির ঠিকানা ছিলো 3, York Road, Rangoon। রেঙ্গুন প্রতিনিধি ছিলেন উ থিন মং।১৯২৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ব্রিটিশ লেখক W.A Maclearn কর্তৃক সম্পাদিত ” Rubber,Tea, & Cacao” বইতে “খিজারী বার্মা টোবাকো লীফ লিমিটেড কোম্পানি” কে বাংলা প্রদেশের সামনের সারির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শেয়ারের ছবির নিচে Managing Agent হিসেবে ইংরেজিতে খিজারী তাঁর নাম স্বাক্ষর করেন। তাঁর হাতের লেখাই প্রমাণ করে তিনি ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। এছাড়াও ১৯২২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি সাময়িকী থেকেও খিজারী’র ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতার কথা জানা যায়। খিজারী যদি ব্যবসাই করবেন,তবে তাঁকে দালাল বলা হয় কেনো? যদি তিনি ব্যবসায় করবেন, তবে দালালি করলেন কবে? যদিও সমাজের চোখে খারাপ কিছু পেশায় ‘দালাল’ শব্দটি ব্যবহৃত হওয়ার কারনে মানুষ ‘দালাল’ শব্দটিকেও খারাপ চোখে দেখে। তিনি জেনারেল মার্চেন্ট এবং কমিশন এজেন্টের ব্যবসা করতেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেউ যদি কমিশন এজেন্টের ব্যবসা করে, তাকে কি ‘দালাল’ বলা যাবে?

উত্তর হলো- না,বলা যাবে না।

 

ছবি: খিজারীর ব্যবসার লাইসেন্স

কেননা ইংরেজিতে “Broker ” এবং “Commission Agent ” শব্দ দুটিতে পার্থক্য আছে। যা সাধারণ মানুষ বোঝে না। আর বোঝে না বলেই খিজারী’র নামের সাথে ‘দালাল’ শব্দটিও জুড়ে দেয়। আর এখনতো সেটা উ খিজারী’র নামের অংশতে পরিণত হয়েছে।খিজারী তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের Managing Agent হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র Moung Khyw Zan Hla পিতার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ সরকারের Calcutta Gazette এ বহুবার খিজারী’র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান “Kheezarhee Burma Tobacco Leaf Ltd. Co.” এর নাম প্রকাশিত হয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারনে। সর্বশেষ ১৯৪১ সালের ২৩শে অক্টোবর কোম্পানিটি কিছু শর্তাদি না মানলে বিলুপ্তি হতে পারে মর্মে একটি সতর্কীকরণ নোটিশ প্রদান করা হয়। অবশ্য এর এক বছর আগে ১৬ই জুন ১৯৪০ সালে খিজারী’র মৃত্যু হয় বলে জানা যায়। তাছাড়া ১৯৪১ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের Governor General in Council কর্তৃক প্রকাশিত Joint Stock Companies in British India এর তথ্য মতে Companies working in India on the 31st March 1938 এর তালিকায় “খিজারী বার্মা টোবাকো লীফ লিমিটেড কোম্পানি’র” নাম পাওয়া যায় না। তার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে খিজারী’র জীবনে অর্থ কষ্ট নেমে আসার তথ্যটি সত্য হলেও হতে পারে। যার কারনে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি বাজারে অনিয়মিত বা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

শিক্ষাক্ষেত্রে খিজারীর অবদান

রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় বর্তমানে যা একটি সরকারি বিদ্যালয়। খিজারী রামুতে আরো একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন যা রামু খিজারী বার্মিজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত।এছাড়াও শিক্ষার প্রতি দানবীর উ খিজারী’র প্রবল আগ্রহ এবং Capt.J.W Pitavel এর সহায়তায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রকল্প “Poverty Problem Study Fund” এ অবদানের কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রকাশনা হতে জানা যায়। খিজারী নিজ জন্মভূমিতে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এই দুটি বিদ্যালয় স্থাপন করে নিজেকে অমর করেছেন রামুবাসীর অন্তরে। ইতিপূর্বে রামু থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মারক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় ১৯১৪ সালে,যা পরে ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে।

ছবি : খিজারীর প্রতিবিম্ব

দানবীর উ খিজারী তঁর প্রয়াত স্ত্রী ড মি চ্যান ম্রা’র (Daw Mi Chan Mra) (১৯২১ সালে প্রয়াত) স্মরণে রামুতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন বলে সমসাময়িক লেখা থেকে জানা যায়। তবে সেটি কোনটি? সে বিষয়ে জানা যায় নি। হতে পারে সেটি বিলুপ্ত হয়েছে। আমাদের রামুর গর্ব খিজারী কক্সবাজার আইনজীবীদের বার ভবনের পাঠাগারটির জন্য ১০০০/- টাকা প্রদান করেছিলেন। এছাড়াও কক্সবাজার মধ্যে ইংরেজি স্কুল অর্থাৎ বর্তমানে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য যতবার তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়া হয়েছে, ততবার তিনি ১০০/- টাকা মানি অর্ডার করে পাঠিয়ে দিতেন কলকাতা থেকে। চট্রগ্রাম টাউন হলের জন্যও তিনি ৩৫০০/- টাকা দান করেছিলেন। তৎকালীন বার্মা চেম্বার অব কমার্সে তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর স্বরণে তিনি একটি পাঠাগার স্থাপন করে দেন। রামু রামকোট সংস্কারেও ব্যাপক অর্থ দান করেছিলেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত Maha Bodhi Journal Vol.29 তে উল্লেখ আছে যে, শ্রীলংকার অনাগরিক ধর্মপালের তত্ত্বাবধানে কলকাতার কলেজ স্কয়ারে নব নির্মিত “ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠান যা ২৬শে নভেম্বর ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত হয়,তাতে খিজারী অন্যান্য দাতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০০/- টাকা দান করেন। তিনি St.Xavier’s College এর মেধাবী ছাত্রদের জন্য ২০/- টাকা হারে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। আর এ জন্য কলেজ কতৃপক্ষ ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই ডিসেম্বর তাদের Wood Stock Letters প্রবন্ধে খিজারীকে ধন্যবাদ দেওয়ার প্রস্তাব পেশ করে। এই তথ্যটি পরবর্তিতে ১লা জুলাই ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার থেকে প্রকাশিত “Journal of Indian educational progress in all branches “প্রবন্ধেও উল্লেখ করা হয়। ইংরেজ Capt. J.W Pitavel এর সরসরি তত্ত্বাবধানে এবং কাশিম বাজার মহারাজার অনুদানে নির্মিত Cassimbazar Polytechnic Institute এর পাঠাগারের জন্য খিজারী তৎকালীন মুদ্রায় ১০০০/- টাকা দান করেন। খিজারী’র এই অবদানের কথা Capt. J.W Pitavel তাঁর রচিত “Self Government & the Breed Problem” প্রবন্ধে শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করেছেন। সে সাথে তাঁরই তত্ত্বাবধানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Poverty Problem Study Fund গঠনে খিজারী’র অবদানের কথা স্বরণ করতে ভুলে যাননি। আজীবন মানুষের কল্যানে কাজ করে যাওয়া খিজারী নিজ মাতৃভূমি রামুকে যেমন ভুলে যাননি,তেমনি যেখানে তিনি অবস্থান করতেন সেই কলকাতাতেও তিনি অনেক জনহিতকর কাজ করে গেছেন। তিনি কারখানা স্থাপন করে স্বদেশী আন্দোলনে যেমন নিজেকে জড়িয়েছেন। ঠিক তেমনি ব্রিটিশ সরকারের সাথে ভালো সম্পর্কও টিকিয়ে রেখে ছিলেন। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের হাত ধরে শুরু হওয়া Archaeological Survey of India বা ASI এর বিভিন্ন খননকার্য পরিচালনায় অর্থও প্রদান এবং তাঁর কাছে অর্থ চেয়ে ASI কতৃপক্ষের যোগাযোগের বিষয়টি তাই প্রমাণ করে।

বৌদ্ধ ধর্মে খিজারীর অবদান

কুশিনগরে বৌদ্ধ বিহার নির্মাণের জন্য ১৮৯৮ সালে খিজারী তৎকালীন মুদ্রায় নগদ ১০০০/- টাকা তুলে দিয়েছিলেন ভিক্ষু মহাভিরের হাতে। কিন্তু টাকা নিয়ে কলকাতা থেকে কুশিনগর যাওয়ার পথে দিউর (Deor) নামক স্থানে মহাভিরকে ডাকাত দল আক্রমণ করে সব টাকা ছিনিয়ে নেয়। মহাভির তখন কুশিনগর থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন। পরে অবশ্য খিজারী তাঁকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করাসহ আরো ১০০০/- টাকা পাঠিয়ে দেন ভিক্ষু মহাভিরের কাছে। এর মধ্যে কলতাতায় খিজারী’র সাথে চট্রগ্রামের সন্তান ভিক্ষু কৃপাশরণ মহাথেরো ও আরাকানের শ্রমণ শিন চন্দ্র পরবর্তী নাম ভিক্ষু উ চন্দ্রমনি, (যিনি ভারতের সংবিধান প্রণেতা ডঃ আম্বেদকারকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলেন) ভিক্ষু’র সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। ১৯৯০ সালে বৌদ্ধ ধর্মাংকুর সভা কলকাতা থেকে প্রকাশিত হওয়া Kripasharan Mahathera 125th Birth Anniversary Volume থেকে জানা যায়, ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে কৃপাশরণ মহাথেরো যখন বৌদ্ধ তীর্থ শ্রাবস্তির উদ্দেশ্যে ভ্রমনের উদ্যেগ নেন,তখন দানবীর খিজারী কৃপাশরণের ভ্রমনের সকল ব্যায়ভার বহন করেন। কৃপাশরণ মহাথেরোর সাথে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর এতটাই ভালো সম্পর্ক ছিলো যে,কৃপাশরণের অনুরোধে চট্রগ্রামের অন্তত ছয়টি H.E School বা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে।

ওদিকে আরাকানিজ শ্রমণ শিন চন্দের সাথে খিজারী’র কাহিনীটি আরো চমকপ্রদ। Calcutta University কর্তৃক ১৯৯০ সালে প্রকাশিত “History of Buddhism in Arakan” বইটি থেকে জানা যায়, ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে শ্রমণ অবস্থায় শিন চন্দ্র (পরবর্তিতে উ চন্দ্রমনি) কলকাতায় খিজারী’র বাসায় গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করেন। এরপর বিভিন্ন সাক্ষাতে উ খিজারী এবং শ্রমণ শিন চন্দ্রের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে।বিশেষ করে শিন চন্দ্রের মধ্যে মানবতার জন্য কাজ করার আকুলতা অভিজ্ঞ খিজারী’র চোখে অচিরেই ধরা পড়ে। ২০০২ সালে ভারতের সারনাথ থেকে প্রকাশিত The Life Story of Sri Bhaddhanta Chandramani Mahathera বইটি থেকে জানা যায়, ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে দানবীর উ খিজারী তাঁর ছোট ভাই দ অং,স্ত্রী ড মি চ্যান ম্রা, ছেলে ক্যা যান হ্লাকে (অন্য ছেলে কিয়াও হটুনের তখনো জন্ম হয়নি)সাথে নিয়ে রামুতে আসেন শ্রমণ শিন চন্দ্রকে উপসম্পাদা বা ভিক্ষু করানোর উদ্দেশ্যে।

খিজারী অনেক অর্থ খরচ করে উক্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ঐ অনুষ্ঠানে তৎকালীন বার্মার স্বনামধন্য ভিক্ষু সহ ভারতের অনেক ভিক্ষুও উপস্থিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, ঐ অনুষ্ঠানে খিজারী’র ছেলে ক্যা যান হ্লাও শ্রমণ হয় (সকল বৌদ্ধ পুরুষদের জীবনে অন্তত একবার শ্রমণ হতে হয়,যাকে শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষা নেয়া বলে)। শ্রমণ শিন চন্দের নতুন নাম দেয়া হয় ভিক্ষু উ চন্দ্রমনি। আর অমাদের রামু থেকেই শুরু হয় ভদন্ত উ চন্দ্রমনি’র কর্মময় জীবনের যাত্রা। আর খিজারী’র কল্যাণেই রামুবাসীর নাম চিরদিনের জন্য সেই ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে যায়। বৌদ্ধ ধর্মের কল্যাণের জন্য খিজারী’র সম্ভবত সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ বা পরোলক গমণের স্থান কুশিনগরে খনন কার্য পরিচালনা করার লক্ষ্যে Archaeological Survey of India কে অর্থ প্রদান করা। ১৯২৬ সালে Calcutta Government of Indian Central Publication Branch কর্তৃক প্রকাশিত “Annual Report of the Archaeological Survey of India 1923-1924” থেকে জানা যায় ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে দানবীর খিজারী তৎকালীন মুদ্রায় ৫০০০/- টাকা কুশিনগরে খনন কার্য পরিচালনার জন্য গোরকপুর সরকারি রাজস্ব অফিসে জমা করেন। পরবর্তিতে সংস্থাটির ১৯২৫-২৬ সালের রিপোর্টে খিজারী’র প্রদান করা অর্থের খরচের কথা উল্লেখ করা হয়। এবং এর জন্য ব্রিটিশ সরকার উ খিজারী’র কাছে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন। বর্তমানে কুশিনগরে মিয়ানমার বৌদ্ধ বিহারটি যে জায়গায় অবস্থিত, তা সম্পূর্ণ খিজারী’র দানকৃত অর্থে ক্রয় করা হয়। শুধু তাই নয়, মিয়ানমার বিহার কমপ্লেক্সের ভেতরে দ্বিতল পুরনো বিহারটি নির্মাণের জন্য উ খিজারী সমস্ত ব্যায় বহন করেন।

১৯৪৮ সালে The Maha Bodhi Society of Ceylon ( Sri Lanka) কর্তৃক প্রকাশিত Devapriya Valisinha কর্তৃক রচিত “Buddhist Shrines in India” গ্রন্থে খিজারী কর্তৃক কুশিনগরে নির্মিত ধর্মশালার কথা উল্লেখ আছে। The Life Story of Sri Bhaddhanta Chandramani Mahathera বইটিতে উল্লেখ আছে যে, ১৯০১ সালে উ খিজারী কুশিনগরে অবস্থিত মহাপরিনির্বাণ টেম্পলে বৌদ্ধদের ধর্মীয় কাজ আবারো শুরু করার অনুমতি চেয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেন। সে আবেদনটি মঞ্জুর করা হয়।এখনও এর সুফল দুনিয়ার সকল বৌদ্ধরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছে। বর্মি রাজা মিন্ডন কর্তৃক বিহার প্রদেশের বৌদ্ধগয়ায় স্থাপিত বার্মিজ ধর্মশালার দখল নিয়ে হিন্দু পুরহিত এবং রাখাইনদের মধ্যে একটি মামলা কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিলো। সে মামললার খরচ চালানোর জন্য ১৯০০-১৯১১ সাল পর্যন্ত খিজারী নিয়ম করে রাখাইন প্রতিনিধিদের ২০/- টাকা প্রদান করতেন।Maha Bodhi Journal Vol.61 তে সেটা উল্লেখ আছে। উক্ত মামলার কার্যক্রম দেখার জন্য বার্মা থেকে কোন প্রতিনিধি কলকাতায় আসলে তাঁরা খিজারী’র ইডেন হসপিটাল রোডের বাসাতে উঠতেন, বলে Maha Bodhi journal, 1910, Vol. 18 তে উল্লেখ আছে।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার এড. শিরুপন

আইনজীবী, অনুবাদক, গবেষক

১১ টি মন্তব্য

  1. শিপ্ত,
    দ্যাখা যাক। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।