কিছু কথা,প্রেক্ষিত পাহাড়

রাঙ্গামাটি,বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে গঠিত “পার্বত্য চট্টগ্রাম”।পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে গড়ে ওঠা সৌন্দর্যের লীলাভূমি বিশাল বিশাল সুউচ্চ পাহাড়।দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে এই পাহাড়ের অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈচিত্রটা যেমনি আলাদা, তেমনি আলাদা পাহাড় এবং পাহাড়ের বুকে বসবাস করা প্রকৃতিপ্রেমী প্রাণবন্ত সহজ সরল সাদামাটা পাহাড়ী মানুষগুলোর ইতিহাস।পাহাড়ের বুকে বসবাসরত ১৩ ভাষাভাষি ১৪টি জুম্ম জাতীসত্তার মানুষগুলো ইস্পাত সংগ্রামী এবং প্রকৃতিপ্রেমীও বটে।তারা প্রতিনিয়ত পাহাড় প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে, বেঁচে থাকার তাগিদে,দু বেলা দু-মুতো অন্ন মূখে তোলার তাগিদে।পাহাড়ে এমন কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকা রয়েছে, যেখানে প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে জীবিকা নির্বাহ করার বিশেষ কোন ব্যাবস্থা নেই।এর মধ্য কয়েকটি হলো বান্দরবান জেলার থানচি,রোয়াংছড়ি—-, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ির সাজেক এবং নাম না জানা আরো অনেক প্রত্যন্ত এলাকা।যে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে জুম্মদের বেঁচে থাকতে হয় কখনো একবেলা খেয়ে কিংবা না খেয়ে কেবলমাত্র এক কাপড়ে।

নেই কোন বাজারজাতকরণের সঠিক ব্যাবস্থা,সেখানে নেই কোন যাতায়তের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা,নেই কোন যথাযোগ্য চিকিৎসা সুবিধা।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গীও ঐসব প্রত্যন্ত এলাকার পাহাড়ী মানুষগুলোর জন্য একেবারেই শূণ্য।
১৯৭১ সালের ৯ মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত লুন্ঠনের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।অপ্রিয় হলেও সত্য যে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং পাহাড়ে অনুপ্রবেশকারী সেটেলার বাঙালীদের দ্ধারা নিপীড়ন, নির্যাতন,শোষণ, বঞ্চনার শিকার হয় পাহাড়ের ভূমিপূত্র পাহাড়ী মানুষগুলো।১৯৯৭ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির “পার্বত্য চুক্তি” স্বাক্ষরের পূর্বে সেনা সদস্য এবং নতুন বসতিকারী সেটেলার বাঙালীরা পাহাড়ী এলাকাগুলোতে একযোগে ব্যাপক হামলা চালায় এবং নিহত, আহত,অপহরন,ধর্ষণ হয় লক্ষ লক্ষ পাহাড়ী বাপ-ভাই, মা-বোন।যা একটা সদ্য স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটা ছিল খুবই ব্যার্থটার এবং লজ্জার বিষয়।


৯৭এ তথসময়ের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির মধ্য “পার্বত্য চুক্তি” স্বাক্ষরিত হলে পাহাড়ীদের মনে হতাশার গ্লানি মুঁছে ফেলার একটা স্বপ্ন জেগেছিল,কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় পাহাড়ীদের সেই স্বপ্ন সেই জায়গাতেই স্বপ্ন হয়ে থেকে গেল বাস্তবতার কিঞ্চিৎ পরিমান রূপরেখার দেখা পেল না পাহাড়ীরা সেই স্বপ্নের।”পার্বত্য চুক্তি” স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেও পাহাড়ীদের জীবনপ্রণালীর বিন্দুমাত্র উন্নতি হয় নি।বরং উল্টো দুঃখের ওজন বৃদ্ধি হয়েছিলো।”পার্বত্য চুক্তি” স্বাক্ষরের পূর্বে ৮০’র দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো অহরহ সেটেলার বাঙালী।সেই সব সেটেলার বাঙালীরা ক্রমে ক্রমে পাহাড়ীদের জায়গা জমি দখল করতে থাকে এবং তাদের পাশে সার্বক্ষণিক সুবিধার্থে নিয়োজিত ছিল সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য এবং বিডিআর বাহিনী।তারপরে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থাৎ পাহাড়ের বুকে জারি করা হয় সেনা শাসনের নামে দাবানল।সেই দাবানলে পুড়ে ছাঁই হতে থাকে পাহাড়ের পাহাড়ী মানুষগুলো এবং মানুষগুলোর ঘরবাড়ীগুলো।১৯৯৭ থেকে ২০১৯ আজ অবদি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি “পার্বত্য চুক্তি”র মৌলিক ধারাগুলো।চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ একপাশে রেখে আওয়ামীলীগ সরকার বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে একের পর এক জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী ও পার্বত্য চুক্তি পরিপন্থী কাজ।দীর্ঘদিনের অববাহিকায় পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্য বাসীর মনে জন্ম নিয়েছে আওয়ামীলীগ সরকারের প্রতি ক্ষোভ আর হতাশা।

যা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
বর্তমানেও পাহাড়ীদের উপর সেনাবাহিনী এবং সেটেলার বাঙালীদের নিপীড়ন, নির্যাতন থেমে নেই।কখনো পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘর আবার কখনো লুন্ঠন ইত্যাদি দানবীয় কার্যকলাপ প্রতিনিয়ত সংঘটিত হচ্ছে সেটেলার বাঙালী কতৃক পাহাড়ী মানুষগুলোর উপর।প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে পাহাড়ী মা-বোন সহ শিশুদের ধর্ষণ কখনো সেটেলার বাঙালী কতৃক আবার কখনো সেনাবাহিনীর মত দেশের গৌরবীয় সন্তানদের কতৃক।পাহাড়ে পাহাড়ীদের উপর যে সমস্ত নিপীড়ন নির্যাতন হত্য নারী ও শিশু ধর্ষণ করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ বিচার বহিঃর্ভূত। বিচারের দাবিতে মাঠে নামলেই দেশদ্রোহীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয় পাহাড়ীদের উপর।২০১৭ সালের জুন মাসের ২ তারিখ সেনাবাহিনী এবং সেটেলার বাঙালী কতৃক একযোগে পুড়িয়ে দেওয়া হল লুংগুদুতে পাহাড়ীদের ৩ টি গ্রামের মোট ৩ শতাধিক ঘরবাড়ি।রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গীর অনুকূলে হয়নি কোন সঠিক বিচার।২০১৮ সালের ২২ শে জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলার অরাছড়ি নামক গ্রামে রাতের অন্ধকারে একদল সেনা সদস্য কতৃক নিজ বাড়ীতে ধর্ষণের শিকার হয় দুই মারমা কিশোরী (আপন দুই বোন)।তার সুস্থ বিচারের দাবিতে যখন পাহাড়ীরা তিন পার্বত্য জেলায় মিছিল সমাবেশ করেছিলো তখন তাদের লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল দেশদ্রোহী ও সন্ত্রাসীর তকমা।

খাগড়াছড়িতে সেটেলার বাঙালী কতৃক ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর যৌনাঙ্গে গাছের গুড়ি ঢুকিয়ে হত্যার শিকার হয়েছিলো ১০ বছরের শিশু কৃত্তিকা ত্রিপুরা। এরকম আরো অহরহ ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের খাতায় পড়ে আছে নিথরভাবে।যা স্বাধীন সার্বভৌমত্বের অধিকারী গণতন্ত্র কায়েমী বাংলাদেশের জন্য খুবই লজ্জার বিষয়।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার তপন চাকমা

নিপীড়িত,নির্যাতিত,শোষিত,বঞ্চিত,সর্বহারা মেহনতি মানুষের পক্ষে থাকবো সদা সর্বদা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।