কেমন দল গঠন করতে যাচ্ছে নুরুরা

()

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরু নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। যুব, শ্রমিক ও প্রবাসী অধিকার পরিষদসহ মূল দল নিয়ে শিগগিরই আত্মপ্রকাশের কথা জানিয়েছেন তিনি। আগে থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে তৈরী হওয়া এই তরুণদের ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। কিছুদিন আগে জামাত থেকে বহিষ্কৃত ও সাবেক শিবির নেতা মুজিবুর রহমান মঞ্জু  ‘এবি পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। সে সময় সমালোচনা ছিল করোনা মহামারি কি রাজনৈতিক দল গঠন করার সময়! কিন্তু  সে সমালোচনার মুখে অধিকার পরিষদকে পড়তে হচ্ছে না। কারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতারা করোনকালে নিম্মবিত্তদের ঘরে সাধ্যমত ত্রাণ নিয়ে গেছে।

নুরুল হক নুরুদের দল গঠন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের একটা আলোচনার জন্ম দিবে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে নুরুদের গতিবিধির উপর নজর রাখছে। ঠিক কোন শ্রেণির বা মতাদর্শের লোকদের নিয়ে তারা দল গঠন করতে যাচ্ছে, মধ্যবামপন্থি নাকি মধ্যডানপন্থি আদর্শ ধারণ করবে, জাতীয়তাবাদী, মার্ক্সবাদী নাকি ভাসানীর মতাদর্শকে সামনে আনবে এসব অবশ্যই আলোচনার বিষয়।

এবি পার্টির চেয়েও গুছিয়ে ও আন্তজার্তিক অঙ্গনে আলোচনা করেই নুরুরা দল গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে। ইতিমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও জার্মান রাষ্ট্রদূতের সাথে নুরুল হক নুরুর ভাল সম্পর্কের কথা সবাই জানে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও বাংলাদেশে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর দেওয়া ত্রাণও বিতরণ করেছেন নুরুল হক নুরু।

এটা অনস্বীকার্য যে শুরুর দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বড় অংশ ছিল ছাত্রলীগের কর্মী। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা এই তরুণদের চাহিদা ছিল সরকারি চাকরি। পরে নানা আন্দোলন ও সংঘর্ষের পর এই প্লাটফরমের অনেকেই সরকারের সমালোচক হয়ে উঠেন এবং সরকারের সমালোচক অনেকেই যোগ দেন তাদের সাথে।

বর্তমানে দল গঠন করার ঘোষণা দেওয়ার সবচেয়ে বেশী তাচ্ছিল্য ভরে সমালোচনা করছে ছাত্রলীগ।ছাত্রলীগ সাবেক ও বর্তমান অনেক নেতা নুরুকে কোন নেতাই মনে করেন না। ছাত্রলীগ তাকে নিয়ে যেরুপ সমালোচনা করে ভীষণ রকম ঘৃণা না থাকলে এমন সমালোচনা করা যায় না। তবে নুরুদের দল গঠনের ফলে ছাত্রলীগের সমর্থক বা ক্ষমতা চর্চায় কোন ব্যাঘাত হবে বলে মনে হয় না। তবে এটা ঠিক গত এক দুই বছরে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে তারা ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে নাই আর বাম দলগুলো বড় আকারে সাধারণ ছাত্রদের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ।

ছাত্রলীগ বা আওয়ামীলীগ নুরুদের উদ্যোগের যতই সমালোচনা করুক নুরুরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের শ্রদ্ধাকে বলবৎ রেখেছেন এবং রাখবেন। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে কিছু উগ্রপন্থিদের সমর্থন আদায়ের যে বুমেরাং চেষ্টা বিএনপি করেছিল সেটা তারা করবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় শহিদ মিনারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়  কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উপর যখন ছাত্রলীগ হামলা করল তখন বামপন্থি কয়েকটি ছাত্র সংগঠন তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। হামলার বিচার দাবির পাশাপাশি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাথে বৃহত্তর একটি জোট গঠনের চেষ্টা চালায় বাম দলগুলো। কিন্তু নুরুল হক নুরুরা ঠিক বাম হতে চায়নি।

তারা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে যে বিষয়টা নিয়ে বেশী সোচ্চার থেকেছে তা হলো ভারতের আগ্রাসন ও সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা। একসময় বিএনপি ও জামায়াত ভারত বিরোধীতার বোধকে ধরার চেষ্টা করত। কিন্তু গত এক দশকের প্রথম পর্যায়ে বিএনপি শুধু নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ও পরবর্তী সময়ে ভারতের সাথে লিয়াঁজু নিয়ে ব্যস্ত ছিল। জামায়াতও ভারতের বিরুদ্ধে কঠিন শব্দ প্রয়োগ থেকে বের হয়ে এসে ভারতের সাথে অপ্রকাশ্য একটি সম্পর্ক তৈরীর তদবির করে আসছে।  বিগত সময়ে ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলতে যেকোন রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশী সোচ্চার ছিল অধিকার পরিষদের নেতারা। ফলে ভারতবিরোধী সমর্থন তারা বেশ ভাল দখলে নিতে পারবে। এছাড়া ধর্ষণের বিচার চেয়ে মানবন্ধন, আবরার হত্যার বিচার দাবি ও এমনকি অগ্নিকান্ডস্থল পরিদর্শন করে সস্তা সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টাও করেছে নুরুর দল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী ও জিয়াউর রহমান সহ জাতীয় নেতাদের নাম সম্মানের সাথে নিয়েছেন নুরুল হক নুরু। তবে আশ্চর্যজনক একটা ঘটনা হচ্ছে বাংলাদেশের আলোচিত একজন ওয়ায়েজ মিজানুর রহমান আজহারী যিনি জামায়াতপন্থি বলে আলোচনা আছে তার দেশ ছাড়া নিয়ে মন্তব্য করে বসেন নুরু। তিনি বলেন, ‘আজহারীকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।’ নুরুল হক নুরুর এই মন্তব্যের পর বামপন্থিবা নড়েচড়ে বসেন। না নুরুল হক নুরু তাদের মতন নয়। আজহারী একজন জামায়তপন্থি আলোচক হওয়া সত্ত্বেও  নুরু তাকে নিয়ে কথা বলেছেন জামায়াতের সাথে সখ্যতা তৈরী জন্য নয়। বরং আজহারী দেশে ও প্রবাসে ধর্মভীরু নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলমানদের কাছে যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাকে নিজের করে আনার চেষ্টা করেছেন নুরু। এছাড়া নুরু একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন তারা ধর্মভিত্তিক দল না হলেও ধর্মের প্রচার, প্রসার ও ভিত্তির উপর তাদের জোর থাকবে।

 মধ্যবিত্ত মুসলমানদের আবেগকে রাজনৈতিক পুঁজি করা দেশে নতুন নয়। হুসাইন মু. এরশাদ আরব দেশের সমর্থন ও মধ্যবিত্ত মুসলমানদের খুশী করতে শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা এবং মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজে খুতবা দিয়েছেন। তার এসব কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে একজন ভাল মুসলমান হিসাবে প্রমাণ করা। ফলে মধ্যবিত্ত মুসলমানদের মন জয় করতে নুরুরা ইসলামের জনপ্রিয় কাজগুলো করবেন বলেই প্রতীয়মান হয়। জামায়াত অন্যান্য ইসলামিক দল থেকে নিজেকে আলাদা করার জন্য  নিজেদের ‘আধুনিক ইসলামিক দল’ হিসাবে প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু জামায়াতের একাত্তরের বিতর্ক, নানা সময় নানা দলে যোগ দেওয়া, সাম্প্রতিককালের ভাঙন ও সর্বশেষ রাজনৈতিক দল হিসাবে ব্যর্থতায় নিজস্ব তেমন কোন সমর্থন আদায় করতে পারেনি। ফলে আধুনিক ইসলাম নিয়ে উচ্ছ¡সিত একটি অংশের সমর্থন পেতে পারে নুরুদের নতুন দল।

প্রবাসী অধিকার পরিষদ গঠনটা নতুন হলেও অপ্ত্যাশিত নয়। নুরুদের বড়  একটি সমর্থকগোষ্ঠী প্রবাসের। বিশেষ করে ফেসবুক তাদেরকে প্রবাসীদের কাছে নিয়ে গেছে। ইউরোপীয় প্রবাসীরা ইউরোপে গিয়ে দেখেছে একটা রাষ্ট্রের পাবলিক সার্ভিস কেমন হতে পারে। ফলে দেশের নানা খাতে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় তারা হতাশ। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিকরাও দেশের বিমানবন্দরে নেমে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েন। বড় দুইদল বিএনপি ও আওয়ামীলীগকে তারা সরকার ও বিরোধী উভয় রুপে দেখেছে। ফলে তারা নতুন কোন ভোরের আশা দেখেন না। এই দুই দলের বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনই বৃহত্তর আন্দোলন হয়েছে। এতে তাদের উপর ভরসা রেখেছেন অনেক প্রবাসীরা। ছাত্র অধিকার পরিষদ অনেক প্রবাসীর কাছ থেকে আর্থিকভাবেও সহযোগিতা পেয়ে থাকে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তানের পেছনে ছাত্রলীগের হামলা যেমন দায়ি তেমনি দায়ি বিএনপির ব্যর্থতা। বিএনপি গোটা এক দশকে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা ব্যতিত ভাল বিরোধী দল হওয়ার চেষ্টা করেনি। বিএনপি সমর্থক বর্জুয়া শ্রেণিও বিএনপির উপর হতাশ। খালেদা জিয়ার প্রথমবারের সরকার আর শেষবারের সরকার পরিচালনার মধ্যে বিস্তর ফারাক। ধানের শীষে ভোট দিয়েও মানুষ সার পায়নি।  গত এক দশকে নির্বাচন ব্যতিত সরকারের অন্যান্য বিষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট নিয়ে কোন ধরনের বৃহত্তর শ্লোগান তারা তুলেনি। গত দশকে শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়াই যেন তাদের একমাত্র স্বপ্ন ছিল। ফলে দেশের রাজনীতির উপর হতাশ হয়ে পড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় একটির অংশের সমর্থন নুরুদের দলে ভিড়তে পারে।  সেক্ষেত্রে নতুন দল হিসাবে আওয়ামীলীগ নয় বরং বিএনপির সমর্থনকে কাট করে নিজের করে নিবেন এই তরুণরা। বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসাবে জাতীয়তাবাদী দাবি করার পর জাতীয় পার্টিও একই দাবি তুলে হালে পানি পায়নি। সেক্ষেত্রে আরেকটি দল জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করবে বলে মনে হয়না।

মধ্যপন্থি ইসলামি ঘরোনার (তবে সব ধর্মের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা থাকবে) ও সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়া নেতাদের দল হতে পারে নুরুদের দল। যেখানে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌশল থাকবে ভারতবিরোধীতা।

তবে যে দেশ ৪০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বড় দুই দলে বিভক্ত সেখানে আরেকটি ভিন্ন আঙ্গিকে রাজনৈতিক দলের আদর্শগত ভিত্তি তৈরী করতে নতুন উদ্যোক্তাদের  বেশ সময় লেগে যেতে পারে। এছাড়া যেহেতু একমাত্র নুরুল হক নুরুই জাতীয়ভাবে আলোচিত সেক্ষেত্রে সিনিয়রদের নিয়ে গঠিত দলের মধ্যে জাতীয় আলোচিত নেতা  না থাকলে সেক্ষেত্রে কঞ্চির চেয়ে বাঁশ ছোট হয়ে যাবে। যা নেতৃত্বের ভারসাম্য নষ্ট করবে। তবে সংক্ষিপ্ত সময়ে শর্টকার্ট সফলতা প্রাপ্তি ও ঢাকা বসে নেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখলে নতুন এই দল একটি ব্যানার সর্বস্ব দলে পরিণত হবে। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী মহলে সমর্থন তৈরী করতে তাদের বড় একটি ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হবে।তবে আদর্শগত মিল বা ক্ষমতার স্বাদ পেতে বড় দুই দলের কোনটাতে যোগ দিলে তা নিজেদের অস্তিত্বকে বিলীন করবে৷

কোটা আন্দোলনে আসা বেশীর ভাগ তরুণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসলেও তারা কেন কৃষক পরিষদ গঠন করার চিন্তা করল না সেটা একটি বড় প্রশ্ন।

#…….

লেখকঃ তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

[email protected]

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।