ছবি: দ্যা ডেইলি স্টার

ক্রসফায়ার অথবা আদালত বন্ধ করুন

()

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে টেকনাফ, কক্সবাজার জেলার আওতাধীন একটি উপজেলা। সাগর আর পাহাড়ের বিশালতা অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে কক্সবাজারকে। পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন হাজার হাজার পর্যটক। কক্সবাজার আসলে কেউ বান্দরবান পার্বত্য এলাকা না ঘুরে ফিরে যান না। কক্সবাজার থেকে বান্দরবানের দুরত্ব অল্প। বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, জিরো পয়েন্টসহ চারপাশ ঘেরা বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্ত। আর পর্যটন শহরকে কেন্দ্র করে এখানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে মরণঘাতী মাদক ইয়াবার কারবার। মায়ানমার থেকে মূলত ইয়াবার বিশাল বিশাল লট বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে প্রতিনিয়ত। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলার হাতে আটক হওয়া এবং গবেষণাসূত্রে দেখা যায় অধিকাংশ ইয়াবা কারবারি টেকনাফ, কক্সবাজার, বান্দরবানের। মূলত এই তিন এলাকার লোকজন এপর্যন্ত ইয়াবা চোরাচালানে আটক হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।

২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন কোটি ৬৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮২২ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। (সূত্র : বাংলাদেশ পুলিশ) বর্তমান ২০২০ সালে এসে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের হার দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১৯ সালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী একটি অনুষ্টানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এটা অবশ্যই সুসংবাদ। কিন্তু যুদ্ধটা তখন থেকে একপাক্ষিক যুদ্ধ হয়ে আসছে কেবল। শুধুমাত্র পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা কারবারিই নিহত হচেছন, এতটাই নিখুত যুদ্ধ চলছে যাতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একজনও আহত হন না। সমীক্ষায় দেখা যায় বন্দুকযুদ্ধে এখনো পর্যন্ত একজন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যও গুরুতর আহত পর্যন্ত হননি, তাহলে কেমন বন্দুকযুদ্ধ চলে তা কি আন্দাজ করা যায় না? ২০১৮ সালে র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধ নাটকে নিহত টেকনাফের কাউন্সিলর একেরামের সাথে ১৪ মিনিটের তার স্ত্রী-সন্তানের লোমহর্ষক সে অডিও কথোপকথনের কথা মনে আছে নিশ্চয় ?

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনের বরাতে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলায় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে একাধিক বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৮৭ জন। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ১৭৪ জন, বিজিবি’র সঙ্গে ৬২ জন ও র‌্যাবের সঙ্গে ৫১ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৬১ জন। পুলিশ এসব নিহত ব্যক্তিদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে দাবী করে আসছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী হলে তাদেরকে প্রমাণ ছাড়া বন্দুকযুদ্ধে টেনে এনে হত্যা করা যাবে কিনা ! আসলে বন্দুকযুদ্ধ কি তা আমজনতার ভালোই হিসেব আছে, কেউ ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেন না কিংবা এটাকে ন্যায়বিচার মনে করার খুশিতে প্রতিবাদ করেন না। কিন্তু ক্রসফায়ার কখনোই ন্যায়বিচার হতে পারে না। মাথা ব্যাথা থাকাটা স্বাভাবিক বরং এর কারণে মাথা কেটে ফেলাটা অস্বাভাবিক।

প্রত্যেক বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় খেয়াল করা যায় যে, পুলিশ যাকে ক্রসফায়ার দিবে তাকে গ্রেফতার করে  আদালতে হাজির না করে তাকে নিয়ে ভোররাতে জরুরী মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নেমে যায়। কক্সবাজার কিংবা টেকনাফের নির্দিষ্ট বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক অভিযান চলে সেগুলোর অধিকাংশ মেরিন ড্রাইভ সড়ক এবং নির্জন নানান জায়গায়। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে নিয়ে পুলিশ যখনই অভিযানে নামে পাল্টা গুলির ঘটনা ঘটে এবং যাকে নিয়ে অভিযানে যায় সে মারা যায় প্রতিপক্ষের গুলিতে। অথবা কাউকে আটক না দেখিয়ে ক্রসফায়ার দেয়া আরো সহজ ব্যাপার। ২৮৭ জন ব্যক্তিকে এভাবে নাটকীয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে কক্সবাজারে আর আমরা সচেতন মহল বাহবা দিয়েই গিয়েছি। একটু লক্ষ্য করলে  দেখা যাবে ২৮৭ জন ব্যক্তির সাথে বন্দুকযুদ্ধ প্রায় ঘুরেফিরে একই জায়গায় হয়েছে। আমরা সবাই বাহবা দিয়ে ক্রসফায়ারকে বরণ করেছি কারণ আমরা ভেবেছি ক্রসফায়ার ইয়াবা ব্যবসা বন্ধের একমাত্র সমাধান। সবাই ক্রসফায়ারের পক্ষে কথা বলেছি আর তার প্রতিক্রিয়া পেলাম কয়েকদিন আগে শামলাপুর চেকপোষ্টে মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকেও বন্দুকযুদ্ধ নাটকের চরিত্র হতে হলো শেসমেষ। হত্যা করে ঘটনা শেষ নয়, সাথে ইয়াবা, গাঁজা আর মদের তকমা মেখে দেওয়া হয়েছে। মেজর সিনহার হত্যাকে ধামাচাপা দিতে পুলিশ মামলা দায়ের করেছে, সাসপেক্ট হিসেবে মেজরের দোষ দেওয়া হয়েছে তিনি বন্দুক চালানোর চেষ্টা করেছেন। কথা হচ্ছে তিনি বন্দুক চালানোর কতদূর চেষ্টা করলে পুলিশের গুলি চালানোর আইনি অধিকার থাকে ?

সম্প্রতি খবরে দেখলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টনক নেড়েছে, কারণ একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমি মনে করি তদন্ত শুধু একটি বিষয় মাথায় রেখে আগাতে পারে। শামলাপুর চেকপোস্টে যখন মেজর (অব:) সিনহার গাড়ি এসে থামে তখন সিনহা তার ব্যক্তিগত বন্দুকের ব্যবহার আদৌ করেছিলেন কিনা কিংবা করলেও কতদূর তার ব্যক্তিগত বন্দুকের ব্যবহার করেছেন। কারণ একজন পুলিশ সদস্য হয়েও ততক্ষণ পর্যন্ত গুলি চালাতে পারেন না যতক্ষণ না গুলি চালানোর মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আর পুলিশ হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সুরক্ষার অজুহাতে অযথা গুলি চালালে সে একজন খুনি হিসেবে বিচারের আওতায় আসতে পারে। এখন দেখার বিষয় তদন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে ! বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যুতে এর আগেও অনেক তদন্ত কমিঠি হয়েছে এবং সে নিয়ে মানুষের আস্থাও লক্ষ্যণীয় নয়।

নিজেকে নিয়ে ও চারপাশের অসংখ্য মানুষদের নিয়ে চিন্তা হয়। কখনো এমন ঘটনা আমাদের যেকারো সাথে ঘটবে না তো ! অপরাধ করলে বিচার বিভাগ আছে সঠিক বিচার করার, শাসন বিভাগের কর্তব্য কেবল বিচার বিভাগকে সহায়তা করা, বিচারের গুরুদায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়া নয়। এখন কক্সবাজারে একধরণের ক্রসফায়ারের প্রতিযোগিতা চলছে, কে কতজনকে হত্যা করতে পারে। নিজ জায়গা থেকে আওয়াজ তুলুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড কিংবা ক্রসফায়ার নাটক আর নয়। অচিরেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের সঠিক তদন্তপূর্বক অভিযুক্ত সকল পুলিশ সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক, আর যাতে কেউ ক্রসফায়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার ভাবে। আওয়াজ না তুললে সিনহার মতো আপনিও যেকোন সময় ইয়াবা ব্যবসায়ীর তকমা মেখে ক্রসফায়ারে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। নিরাপত্তার সাথে এই স্বাধীন রাষ্ট্রে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা আমার আপনার সাংবিধানিক অধিকার।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

পৃথিবীর পথে গন্তব্যহীন পরিব্রাজক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।