ছবি: গাজীপুর অনলাইন ডট কম

গৌতম বুদ্ধের জীবন ও কর্ম : বৌদ্ধ ধর্মের প্রথম পাঠ (১ম পর্ব)

()

আনন্দিত লাগছে যে, মহৎ একটি কাজে হাত দিতে পেরে। এই লেখাটি একটি অনুবাদকর্ম। গৌতম বুদ্ধের জীবন ও কর্ম নিয়ে লেখা দু’চারটিখানি কথা নয়। মূলত থাইওয়ান বুদ্ধিস্ট এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত কে.শ্রী ধম্মানন্দ ভিক্ষুর লেখা একটি বই “What Buddhists Believe” পড়ার পর মনে হলো মহামতি গৌতম বুদ্ধের মূল জীবন ও কর্ম বইটিতে যেভাবে আছে এর চেয়ে স্পষ্ট এবং সহজ করে কোথাও বর্ণনা করা হয়নি আগে। বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত করে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করেছেন শ্রদ্ধাবান ভিক্ষু। বইটি পড়ে যখন অনুবাদ করার ইচ্ছে জাগলো থাইওয়ান বুডিষ্ট এডুকেশনাল ফাউন্ডেশনকে ই-মেইল করে আমার ইচ্ছের কথা জানালাম এবং পরিচিতি দিলাম, অবশেষে তাদের পক্ষ থেকে অনুবাদ করার অনুমতি পেয়ে মহৎ এই কাজে নিজেকে সানন্দে নিযুক্ত করলাম। যেহেতু বর্তমান সময় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির, সেহেতু আমার কলম ব্লগের মাধ্যমে শেষ হেডিং এ “বৌদ্ধ ধর্মের প্রথম পাঠ” পরিচয়ে বইটির একেকেটি অধ্যায় একেকবারে অনুবাদ করে অধ্যয়ের নাম সহকারে জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করবো এবং বইটির সম্পূর্ণ অনুবাদ করা শেষ হলে বই আকারে তা প্রকাশ করবো বলে আশা করছি। অনুবাদ কর্মের মাধ্যমে গৌতম বুদ্ধের জীবন প্রকৃতি ও কর্ম বাঙলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে আরো স্পষ্ট হবে বলে মনে করছি, জ্ঞানপিপাসু মানুষরা সঠিক রসদ পাবে এবং মনে করবো তাহলেই আমার কর্ম স্বার্থক। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ট অব্দে উত্তর ভারতে বসবাস করতেন গৌতম বুদ্ধ, যিনি বুদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক। বুদ্ধের ব্যক্তিগত নাম ছিলো সিদ্ধার্থ কিন্তু পারিবারিক নাম ছিলো গৌতম। যখন তিনি বুদ্ধত্ব লাভ এবং বোধিজ্ঞান লাভ করেন বুদ্ধ নামটি তাঁকে দেওয়া হয়েছিলো। বুদ্ধ শব্দের অর্থ জ্ঞানী বা যিনি জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েছে। যদিও তিনি নিজেকে সাধারণত “তথাগত” বলে আখ্যায়িত করতেন এবং শ্রদ্ধা করে তার অনুসারীরা বুদ্ধকে “ভগবা” বলে সম্বোধন করতেন। অন্যান্যদের কাছে গৌতম কিংবা শাক্যমুনি হিসেবে বুদ্ধ পরিচিত ছিলেন। গৌতম যদিও রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তারপরেও রাজদরবারের বাইরের দুঃখময় পরিস্থিতি সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ জন্মালো বারংবার। গৌতমকে ছোটকাল থেকে রাজকীয়ভাবে লালন-পালন করেছিলো তার পরিবার, তাছাড়া তাঁর রাজপরিবার সবদিক থেকে পরিমিত ও অমলিন ছিলো। তাঁর উপস্থিতি ছিলো সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ উপহার। গৌতম রাজপরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকার, উপযুক্ত, উদ্দীপক বিশ্বাসী ও মহিমান্বিত ছিলো। গৌতম ষোল বছর বয়সে মামাতো বোন যশোধারাকে বিয়ে করেন, যশোধারা ছিলো ঐশর্যশালী, সবসময় প্রফুল্ল, লাবণ্য ও মর্যদাপূর্ণ. এসবের পরেও যে গৌতমের বিরক্তের কারণ হয়ে দাঁড়ালো, যদিও পরবর্তীতে রাহুল নামে তাঁদের এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়।

রাজপরিবার, সুন্দর স্ত্রী-পুত্র থাকা সত্ত্বেও গৌতমের অন্তর বিলাসিতার কাছে আটক অনুভূত হয়েছিলো যেনো সোনার খাঁচায় বন্দি পাখি। এসব অনুভূত হওয়ার পর হঠাৎ করে একদিন রাজ্যভ্রমণে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন গৌতম এবং চারদিনে চারটি ভিন্ন দৃশ্য দেখতে পেলো, প্রথম দিনের ভ্রমণে তিনি একজন বৃদ্ধকে দেখতে পেলেন, দ্বিতীয় দিন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, তৃতীয় দিন মরদেহ যাত্রা এবং শেষদিনে একজন নির্জনবাসী সন্ন্যাসীকে দেখতে পেলেন। গৌতম দিনের পর দিন এসব দৃশ্য দেখার পর প্রাথমিক কিছু ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলেন যে, “ জীবন কি তাহলে জন্ম থেকে মৃত্যুর একটি ছোট অধ্যায় মাত্র? ”। নিজেকে প্রশ্ন করলেন গৌতম, জীবনের শেষ গন্তব্য কোথায়? যেখানে জন্ম কিংবা মৃত্যু নেই ! রাজ্য ভ্রমণের শেষ দিনের সন্ন্যাসীর জীবন নিয়ে ভাবলেন কারণ তিনি মানব জীবনের তৃষ্ণা ত্যাগ করেছে, স্থীর হয়েছে, সে চিন্তা করলো এবং এসব ভাবনা গৌতমের গৃহত্যাগ করার প্রথম অধ্যায়ের সূত্রপাত ঘটিয়ে দিলো। সার্বজনীন মানবের দুঃখমুক্তির উপায় জানতে গৌতম দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হলেন এবং গৃহত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন অবশেষে। গৌতমের ২৯ বছর বয়সে এক রাতে ঘুমন্ত অবস্থার স্ত্রী যশোধারা এবং পুত্র রাহুলকে নিরব বিদায় জানিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত ঘোড়া অশ্বকন্থকের পিঠে চড়ে গভীর জঙ্গলের দিকে রওনা হলেন।

ইতিহাসের পাতায় গৌতমের গৃহত্যাগ ছিলো নজীরবিহীন। ক্ষমতা, আনন্দ, রাজকীয় জীবন, ধন-সম্পদের মালিকানা ছেড়ে নানান অসুবিধা, অনিশ্চয়তা নিয়ে একজন সন্ন্যাসী হিসেবে বিচরণ করা শুরু করলেন তিনি। রাজপোশাক ও প্রাসাদ ছেড়ে শুধুমাত্র গেরুয়া রঙের একটি পোশাক ছিলো শরীরে যেটি দিয়ে প্রবল রোদ, বৃষ্টি, শীত এবং বাতাস থেকে নিজেকে রক্ষা করতেন, তাছাড়া তিনি পাহাড়ের গোহা এবং জঙ্গলে বসবাস করতে লাগলেন। গৌতম তাঁর পূর্ব অবস্থান, সম্পদ, নাম-জশ এবং ক্ষমতা নিবৃত্ত করলেন এবং নিজের জীবনকে ভালোবাসা এবং পরিবর্তনের আশায় পরিপূর্ণ করেছেন, এসব তাঁকে দুঃখমুক্তির অনুসন্ধানের পথে পরিচালিত করেছে যা আগে কেউ খোঁজ করেও পায়নি। এভাবে একসময় দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর সাধনা তাঁর জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়ালো। গৌতম সে সময়ের উচ্চতর লেখাপড়া করেছিলেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষকগণ তাঁকে মুক্তির পথ দেখাতে পারবেন এই বিশ্বাসে তাঁদের কাছে নানান ধর্মীয় শিক্ষা নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন এভাবে অধ্যায়নের পরেও তিনি কোনরকম মুক্তির পথ যখন দেখলেন না সন্ন্যাসীদের একটি দলে যোগ দেন এবং তাঁদের ধ্যানরীতি অনুসরণ করে নিজের শরীরের উপর নিরব অত্যাচার চালিয়েছিলো এই বিশ্বাসে যে শরীরের সব শক্তি এবং হস্তক্ষেপকে যাতে চূর্ণ করা যায়, তাছাড়া গৌতম প্রায় বিশ্বাস করে নিয়েছিলো যে এভাবে বুদ্ধত্ব লাভ বা দুঃখমুক্তি পাওয়া যেতে পারে। বলাবাহুল্য যে গৌতম প্রচুর ইচ্ছেশক্তিসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন, এমনকি তপস্যাতেও অন্যান্য তপস্বীকে তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ উপবাস করতে গিয়ে তিনি যখন দেখলেন যে তাঁর শরীরের চামড়া শুকিয়ে গেছে, পেট ও শীরদাঁড়া এক হয়ে গেছে, তখন থেকে সে অল্প অল্প খেয়ে ধ্যান-সাধনা শুরু করলেন। গৌতম এমন কঠোরভাবে ধ্যান করেছিলেন যে আগে কেউ করেনি, এবং এরকম ধ্যান-সাধনা করতে থাকলে তিনি মারা যাবেন এই উপলব্দি আসলো গৌতমের। এমন উপলব্দি না আসলে অবশ্য গৌতম মারা যেতেন।

বৈশাখী পূর্ণিমার রাত। গৌতম গয়ার বোধি বৃক্ষ বা অশ্বত্ব বৃক্ষের নিচে ধ্যানে বসলেন এবং কঠোর ধ্যানে মগ্ন হযে পড়লেন। সেসময়ে তিনি মহাবিশ্বের নানান জটিল প্রশ্ন এবং মানবজীবন ও প্রকৃতির দুঃখমুক্তির সন্ধান তাঁর মনে বিস্ফোরিত হলো। অবশেষে ৩৫ বছর বয়সে গৌতম একজন আলোকিত মানবরূপে বুদ্ধত্ব লাভ করেন এবং হয়ে উঠেন বুদ্ধ। প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে মহামতি গৌতম বুদ্ধ ভারতের অনির্দিষ্টি পথে হেঁটেছেন এবং তার সাধনায় প্রপ্ত জ্ঞান এবং ধর্ম মানুষের মাঝে উন্মুক্ত করেছেন যাতে সাধারণ মানুষরাও চর্চার মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে দুঃখহীন ও উন্নত করতে পারে। পরবর্তীতে যারা বুদ্ধের দেখানো পথ ধরে সন্ন্যাসী হয়েছেন তাঁদের জন্য তিনি কিছু বিধি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তখনকার বর্ণপ্রথা, নারীর অধিকার, ধর্মীয় চিন্তার স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার প্রসারের দ্বার উন্মোচন করার জন্য এবং সমস্ত মানবজাতিকে দুঃখ হতে মুক্ত করার জন্য তিনি বিচরণ করেছেন ভারতসহ বিভিন্ন জায়গায়। জীবনের সবটুকু সময় ধনী-গরীব উভয়ের কল্যানেই ব্যয় করেছেন। এমনকি গৌতম বুদ্ধ আঙুলীমালের মতো পাপী থেকে শুরু করে যে সে সময়ের বেশ্যাবৃত্তির সাথে জড়িত আম্প্রপালীর জীবনে এনে দিয়েছিলেন নতুন সম্ভাবনার দ্বার, তাঁদের জীবনকে করেছেন উন্নত।

মহামতি গৌতম বুদ্ধ জ্ঞান এবং বুদ্ধিদীপ্ততার সর্বোচ্চ স্থরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। প্রতিটি সমস্যার বিষয় নিয়ে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এবং এসব সমস্যার উৎপত্তি ও কারণ পুনরায় ব্যাখ্যা করেছেন। প্রশ্ন-উত্তরে গৌতম বুদ্ধকে পরাস্ত করতে পারা কঠিন আজ অবধি। গৌতম বুদ্ধ সর্বপ্রথম মনোজগৎ ও নানান ঘটনার সর্বাধিক বিশ্লেষক, একজন অতুলনীয় শিক্ষক যিনি বর্তমানের দিনেও অনন্য। ইতিহাসের পাতায় প্রথম মানবজাতিকে নিজেদের জীবন নিয়ে, দুঃখ নিয়ে আলোচনা করার উপায় বের করে দিয়েছিলেন, মানবজাতির মূল্য উত্থাপন করেছিলেন এবং নিজের মাধ্যমে গৌতম বুদ্ধ দেখিয়েছিলেন যে, মানুষ নিজের পরিশ্রম এবং চেষ্টায় জ্ঞান ও মুক্তির সর্বোচ্চ স্থরে পোঁছে যেতে পারেন।

এতো জ্ঞান এবং একজন রাজবংশের উত্তরাধিকারী হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি কখনোই সাধারণ মানুষকে অবজ্ঞা-অবহেলা করেন নি। শ্রেণী এবং বর্ণের পার্থক্যগত পার্থক্যকে বুদ্ধ কোন পাত্তাও দিতেন না, তাঁর মতে সবাই ছিলো সমান ও মানুষ, ধনী-গরীব কেউই তাঁর কাছে মূখ্য ছিলো না, অনায়াসে সবাইকে তিনি দীক্ষিত করেছিলেন বৌদ্ধ ধর্মে। এমনকি গৌতম বুদ্ধের কাছে যখন ভিন্ন বর্ণের কিংবা গরীব কেউ আসতো তাঁদের আত্মসম্মানবোধ আরো বেশি করে অনুভব করতে পারতো তাঁরা এবং তাঁদের অজ্ঞ জীবন মহৎ সত্ত্বার জীবনে উন্নীত হওয়ার পরামর্শ পেতো। মহামতি গৌতম বুদ্ধ সকলের প্রতি ছিলেন খুবই সহানুভূতিশীল (করুণা) এবং জ্ঞানের আলোকবর্তিকা  এবং হয়তো এজন্য আলাদাভাবে এক একজন ব্যক্তিদের জ্ঞানের স্থর তিনি বুঝতে পারতেন এবং সে অনুযায়ী কাকে কিভাবে দুঃখমুক্তির পথ দেখানো যায় তা তিনি ভালোভাবে আয়ত্ত্ব করেছিলেন। শুধুমাত্র একজন আলাদা ব্যক্তিকে জ্ঞানের পথ এবং দীক্ষা দেওয়ার জন্য বুদ্ধ অনেকদূরের পথ হেঁটে যেতেন। তাঁর শিষ্যদের প্রতি গৌতম বুদ্ধ ছিলেন অনুগত এবং স্নেহশীল, সবসময় তাঁদের পরিবর্তন এবং উন্নতির অবস্থান বিষয়ক খোঁজ-খবর নিতেন। যখন তিনি বিহারে থাকতেন, প্রতিদিন অসুস্থ শিষ্যদের দেখতে যেতেন, অসুস্থ শিষ্যদের প্রতি মমত্ববোধ ও পরামর্শ হিসেবে তিনি বলতেন যে, “তোমরা যে অসুস্থ হয়েছো তার মানে আমার খুব কাছাকাছি এসেছো, ভেবে দেখো”। শিষ্যদের পারষ্পারিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার জন্য গৌতম বুদ্ধ সবসময় তাদের মধ্যে নিয়ম এবং আদেশ জারি রাখতেন। তার শিষ্যদের মধ্যে প্রাসন্ধি নামে এক রাজা বুঝতে পারতেন না বুদ্ধ তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের কিভাবে সহজেই একত্রে রাখতেন, মানিয়ে রাখতেন এবং সুন্দরভাবে নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখতেন, প্রাসন্ধি যখন রাজা ছিলেন তাঁর ক্ষমতা ছিলো এবং তখন প্রজাদের নানান শাস্তি দেওয়ার পরেও তিনি তাঁদের মানিয়ে রাখতে পারতেন না বিশৃঙ্খলা হতোই, এনিয়ে তিনি অবাক হয়ে পড়েছিলেন।

অনেক অলৌকিক ক্ষমতা বুদ্ধের বিরাজমান ছিলো কিন্তু এসব নিয়ে তিনি কখনোই তেমন ভাবেন নি। তাঁর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক ক্ষমতা ছিলো সত্যকে নানান প্রশ্নকে এবং মানবজীবনের দুঃখকে ব্যাখ্যা করা এবং একজন সাধারণ মানুষকে তা উপলব্দি করতে সামর্থ্য হওয়ার। নানান চিন্তা ও জীবনের দুঃখমুক্তির শেকল থেকে মানবজাতিকে কিভাবে মুক্ত করা যায় তা নিয়ে তিনি যুক্তিগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। মানবজাতির দুঃখ থেকে মুক্তি লাভের উপায় বলেছেন একজন শিক্ষক গৌতম বুদ্ধ ,যার করুণা অসীম।

বুদ্ধ কখনোই দাবী করেননি যে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, সার্বজনীন নানান ঘটনা, জীবনবিধি আমরা যাকে ধর্ম বলে দাবী করি তা বুদ্ধ সৃষ্টি করেছেন। তিনি নিজেকে শুধুমাত্র “লোকাবিধো” অথবা “বিশ্বজগতের জ্ঞানী” হিসেবে পরিচয় করিয়েছিলেন সবার মাঝে তার কর্মে। সার্বজনীন বিশ্বাস এবং ধর্মীয় ব্যবস্থার কাছে তখন থেকে মহামতি গৌতম বুদ্ধ কখনোই অনুগত বন্দি হিসেবে থাকেন নি। তিনি নির্দ্বিদ্ধায় স্বীকার করেছেন যে ধর্ম সৃষ্টি থেকে শুরু করে বিশ্বজগতের নানান কাজ কখনোই সময় মেনে বা কারো ইশারায় হতে পারে না বরং এসব নিরবধি, এবং এসবের কোন সৃষ্টিকর্তা নেই , এসবের গতিবিধি পরম অর্থে স্বাধীন। মহাবিশ্বের বিদ্যমান প্রতিটি শর্তযুক্ত ক্রিয়া তার নিজস্ব ধর্মের ক্রিয়ার স্বপক্ষে কাজ করে।

বুদ্ধ যা করেছিলো (তার পূর্বোক্ত বুদ্ধদের ন্যায়) তা হলো নিশ্চিত জ্ঞানকে অনুধাবণ করা এবং মানব মুক্তির পথকে পুনরুদ্ধার করে মানবজাতির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। এসব জ্ঞান অর্জনের পর অন্তহীন জন্মচক্রের ঘুরার প্রক্রিয়া থেকে কিভাবে চুড়ান্তভাবে নিজেকে মুক্ত করা যায় এমন উপায়গুলো খুঁজে পেয়েছিলেন এবং তা একজন মানুষের খারাপ দিক এবং অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন তিনি। তাঁর ধর্ম প্রসারের ৪৫ বছর পর, গৌতম বুদ্ধ ৮০ বছর বয়সে কুশিনারাতে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন, হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু, অনুসারী এবং মানব মুক্তির অমূল্য সব নির্দেশনা রেখে যান যা বুদ্ধের ত্যাগ এবং অসীম ভালোবাসার শক্তি এখনো বিরাজমান।

ইতিহাসের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে একজন এইচ. জি ওয়েলস বলেছেন:
আপনি বুদ্ধকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ, সহজ, ধর্মপ্রাণ, একাকী হিসেবে দেখতে পাবেন, যিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য লড়েছেন, একজন মানবিক গুণাবলি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে, এবং এসব শুধুমাত্র শ্রুতি বা শোনা কথা নয় এসব সত্যি। তিনি মানবজাতির আচার-আচরণ নিয়ে বিভিন্ন বার্তা দিয়েছেন আমাদের। বেশিরভাগ আধুনিক উন্নত চিন্তা এবং ধারণা বুদ্ধের সেসময়ের ধারণার সাথে এখনো সঙ্গতিপূর্ণ। নিজেদের স্বার্থপরতা মানব জীবনের সকল দুর্দশা-কষ্ট এবং অতৃপ্ত বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। একজন মানুষ নির্মল হয়ে উঠার আগে তাকে নিজের ইদ্রিয় বা নিজের জন্য বেঁচে থাকতে হবে, তারপর তিনি বিশালতায় মিশে যেতে পারেন, বুদ্ধ এসব শিক্ষায় দিয়েছেন। বুদ্ধ দর্শন ভিন্ন এক অধ্যায়। এমন কিছু মাধ্যমে তিনি আমাদের খুব কাছে ছিলেন এবং আমাদের প্রয়োজনীয়তারও খুব কাছে। আমাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয়তায় গৌতম বুদ্ধের যথেষ্ট রসদ ছিলো এবং তা খ্রীষ্ট্র ধর্ম আসার পরেও বিদ্যমান থেকেছে এবং ব্যক্তিগত অনৈতিকতার প্রশ্নেও বটে।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

পৃথিবীর পথে গন্তব্যহীন পরিব্রাজক

৪ টি মন্তব্য

  1. অ্যাডভোকেট শিরুপন বড়ুয়া

    অনুবাদটি বেশ ভালো হয়েছে।মূল বইটিও খুব ভালো। কিন্তু কষ্ট হয় এটা দেখে যে,অামাদের বেশিরভাগ ভিক্ষুরা এসব বই পড়েন না।অবশ্য ইংরেজি ভাষায় লেখা অনেক ভিক্ষু হয়তো পড়তে পারেন না।তবে এ সমস্ত ভালো ভালো বইগুলো যদি অনুবাদ করে এইভাবে পাঠকদের সামনে নিয়ে অাসা হয়, এবং এরপরও যদি ভিক্ষুরাসহ অন্যান্যরা না পড়েন,তাহলে অার বলার কিছুই নাই।

  2. দাদা প্রথমে আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই যে, এসব বইয়ের সন্ধান আপনিই প্রথমে দিয়েছেন, নাহলে হয়তো এসব মূল্যবান বই কখনো হাতের নাগালে পেতাম না। আমাদের বিশেষ করে বাংলাদেশের বেশিরভাগ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চিন্তা ও দর্শন গৌতম বুদ্ধের চিন্তা ও দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। অবাক করা বিষয় এই যে, বুদ্ধের মুখনিঃসৃত মূল বাণীগুলো আমরা আজ অবধি হাতে পাইনি যা ত্রিপিটকের ধম্মপদে উল্লেখিত। থাইওয়ান থেকে আমি ধম্মপদ ইংরেজীটাও পেয়েছি, সময় এবং জ্ঞানে কুলালে এটার অনুবাদেও হাত দিতে চাই দাদা।

  3. চলতে থাকুন শিপ্ত। বুদ্ধের দর্শন নিয়ে জানার আগ্রহ বহুদিনের৷

  4. ভাই চেষ্টা করে যাবো। দোয়া করবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।