ছবি: অন্তর্জাল।

গৌতম বুদ্ধ : এক অসামান্য দার্শনিক ও ভবঘুরে

()
বৌদ্ধদর্শন ও ডাইলেকটিক্যাল বস্তুবাদ

বৌদ্ধদর্শনের ইতিহাস সুবিশাল ও বিস্তৃত; এর শাখা-প্রশাখাও বিশাল ও বৈচিত্রময়। বুদ্ধের সুমহান বাণী, উপদেশ ও চিন্তাধারাই এ দর্শনের মূল উৎস ও ভিত্তি। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরবর্তীকালে তাঁর শিষ্য ও অনুগামীদের নিয়ে কয়েকবার মহাসঙ্গীতি বা মহাসম্মেলন অনুষ্টিত হয়েছিলো এবং তারই মাধ্যমে বুদ্ধের উপদেশ ও বাণী সূত্রপিটক, বিনয়পিটক ও অভিধম্মপিটক এ ত্রিপিটকে লিপিবদ্ধ করা হয়। এই ত্রিপিটক অনেকগুলো গ্রন্থের সমষ্টি। সূত্রপিটকে বুদ্ধের উপদেশ, বিনয়পিটকে বৌদ্ধ সংঘের নিয়মকানুন এবং অভিধম্মপিটকে দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা আছে। বৌদ্ধদর্শন কিন্তু এই ত্রিপিটকেই শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ নয়। বুদ্ধের দেহত্যাগের পর তাঁর বাণী ও উপদেশকে কেন্দ্র করে অনুগামীদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। ফলে অনেক দার্শনিক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। নাগসেন, নাগার্জুন, বুদ্ধঘোষ, বসুমিত্র, অসঙ্গ, কত্যায়নী, বসুবন্ধু, যশোমিত্র, ভদন্ত প্রভৃতি অনেক বৌদ্ধ দার্শনিক বৌদ্ধদর্শনকে নানাভাবে সমৃদ্ধিশালী ও বৈচিত্রময় করেছেন। তাঁদের দর্শনের বিচিত্র গতিধারা নানাদিক প্রসার লাভ করে এবং পাশ্চাত্যের অনেক ভাবধারা এতে বহুলাংশে প্রভাবান্বিত হয়েছে বলে অনেকেরই বিশ্বাস।

বৌদ্ধদর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বাধীনচিন্তার এক অকৃত্রিম গতিছন্দ। এ গতিছন্দ যুগে যুগে বিকশিত হয়েছে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। ধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনকে কলুষিত করতে পারে নি কোনদিন। অলৌকিক ধ্যানধারণা ও রহস্যবাদ যুক্তির প্রখরতায় বিলীন হয়ে গেছে চিরতরে। অতিজাগতিক ও অতীন্দ্রিয় ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনে ঠাঁই পায় নি কোনদিন। যুক্তির স্বচ্ছতা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এ দর্শনের প্রাণ। এ দর্শন তাই নিজস্ব এক স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল ও আপন বৈশিষ্ট্যে প্রাণবন্ত ও ঐশ্বর্যময়। সাধারণ অর্থে বুদ্ধ দর্শনচর্চা করেন নি; তা তিনি পছন্দ করতেন না। সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ আছেন কি নেই, জগৎ নিত্য না অনিত্য এসব বিরুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্বালোচনায় তিনি নিজেকে আবদ্ধ করেন নি কোনদিন। কেননা তিনি মনে করতেন জীবন-সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এগুলোর কোনো ভূমিকা নেই। দর্শনচর্চায় বিরূপ হলেও তাঁর চারটি ‘আর্যসত্য’ প্রচারের মাধ্যমে তিনি এমন মূল্যবান দার্শনিক মতবাদের প্রণয়ন করেছেন যে দর্শনের ইতিহাসে তা এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। তারই একটি হচ্ছে ডাইলেকটিক্যাল বস্তুবাদ। বুদ্ধ এবং তাঁর অনুগামী বৌদ্ধ দার্শনিকগণ সবাই ছিলেন ডাইলেকটিসিয়ান। অসঙ্গ ও নাগার্জুন ভাববাদী হলেও ডাইলেকটিসিয়ান। জার্মান দার্শনিক হেগেলও ডাইলেকটিসিয়ান, তবে তিনি ছিলেন ভাববাদী। গ্রিসের প্রথম ডাইলেকটিসিয়ান হচ্ছেন হেরাক্লিটাস। অনেকের মতে তিনিই ডাইলেকটিকস প্রণেতা। এ বক্তব্য কিন্তু কোনমতেই মেনে নেওয়া যায় না। কেননা হেরাক্লিটাসের বেশ কয়েক বছর পূর্বেই বুদ্ধ এ সত্য আবিষ্কার করেন।

‘ডাইলেকটিকস’ কথাটি গ্রিস শব্দ ‘ডায়ালগ’ থেকে উদ্ভূত। এর মানে হল তর্ক বা আলোচনা। প্রাচীণকালে গ্রিক দার্শনিকেরা তাদের বিরোধী পক্ষের মতের স্ববিরোধিতা আবিষ্কার করে যুক্তি দিয়ে তা খন্ডন করতেন। তর্কের এই কৌশলের নামই ডাইলেকটিকস। যুক্তির এই পদ্ধতিকে পরবর্তীকালে দার্শনিকগণ প্রাকৃতিক ঘটনা, মানুষের সমাজজীবন ও চিন্তাধারার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। ডাইলেকটিকসের মতে প্রকৃতির বিকাশ হয় পরষ্পরবিরোধী শক্তির ক্রিয়ার ফলে, স্ববিরোধী শক্তির বিকাশের জন্য। মার্কস প্রাকৃতিক ঘটনা পর্যালোচনার জন্য যে প্রণালী ব্যবহার করেন তা হল ডাইলেকটিক্যাল এবং ঘটনাগুলোর তিনি যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তা হল বস্তুবাদী। এজন্য তাঁর মতবাদকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদও বলা হয়ে থাকে।

ডাইলেকটিকসের মতে প্রাকৃতিক ঘটনাপুঞ্জ চিরপ্রবাহমান, নিত্য পরিবর্তনশীল। প্রকৃতি যেন এক অবিভক্ত সমগ্র, যার সমস্ত ঘটনা পরষ্পর নির্ভরশীল, একটি অপরটির সঙ্গে গ্রথিত ও সম্পর্কিত। এখানে চিরস্থায়ী অপরিবর্তনীয় বলে কিছু নেই, আছে এক অবিরাম প্রবাহ, পুরাতনের ক্ষয় ও নতুনের আবির্ভাব। আপাতদৃষ্টিতে কোনো বস্তুকে স্থায়ী মনে হলেও আসলে তা স্থায়ী নয়। তার ধ্বংস অনিবার্য। সমস্ত প্রকৃতিতে ক্ষুদ্রতম জিনিস থেকে বৃহত্তম জিনিস পর্যন্ত চলছে এক অবিরাম প্রবাহ। আবির্ভাব ও তিরোভাবের একটানা ছন্দ। এটাই ডাইলেকটিকসের কথা এবং এটাই বুদ্ধ ও বৌদ্ধ দার্শনিকদের মূল বক্তব্য। মার্ক্স ও এঙ্গেলসের মতো বুদ্ধ সর্বতোভাবে একজন বস্তুবাদী। তাঁর প্রচারিত ধর্মে ঈশ্বর নেই, আত্মা নেই, পরলোক নেই, আছে শুধু অবিরাম প্রবাহ, পরিবর্তন ও রূপান্তর। সমগ্র বিশ্বে চলছে এক নিয়মের অধীনে। এই প্রাকৃতিক নিয়মের নামই ‘ধম্ম’ বা ‘ধর্ম’।
বুদ্ধের মতে নিত্য, অপরিবর্তনীয়, চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর বলে কিছু নেই। জগতের সমস্ত জিনিসই পরিবর্তনশীল, সারা বিশ্বে চলছে বস্তুর বিরামহীন পরিবর্তন ও রূপান্তর। আমাদের জীবন-হচ্ছে এক অবিরাম প্রবাহ, আবির্ভাব ও তিরোভাবের একটানা ছন্দ-জন্ম-মৃত্যুর একটানা স্রোত। জগতে শাশ্বত সত্তা বলে কিছুই নেই, আছে শুধু উৎপাদ্যমান, পরিবর্তন-ইংরেজীতে যাকে বলা হয় বিকামিং। বৌদ্ধ দার্শনিকরা এর নাম দিয়েছেন ভব।

বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে সমগ্র জগতে চলছে এই উৎপাদ্যমান বা ভবের খেলা, জগৎ নিত্য পরিবর্তিত হচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে ঘটছে তার রূপান্তর, প্রতি ক্ষণে ক্ষণে চলেছে আবির্ভাব ও তিরোভাব। অস্তি ও নাস্তি, হ্যাঁ ও না’র মিছিল চলেছে এখানে যুগপৎ। প্রদীপের শিখা যেমন নিয়ত পরিবর্তিত হয় অথচ দুটি অবস্থার মধ্যে ব্যবধান না থাকায় এই ধারাবাহিকতার জন্য একই দীপশিখা মনে হয়, তেমনি আমরা যা সত্তা মনে করি আসলে তা উৎপাদ্যমান বা ভব-প্রতিনিয়তই তার পরিবর্তন হচ্ছে। একমাত্র দ্রুত পরষ্পরার জন্যই জগৎকে শ্বাশত বলে মনে হয়-কোনো জিনিসকে স্থায়ী মনে হয়। আসলে জগতে চলছে অন্তহীন বিরামহীন একটানা পরিবর্তনের স্রোত, গতি ও প্রবাহ। একটি জিনিসের উৎপন্ন হচ্ছে, অপরটির বিনাশ হচ্ছে বর্তমান হয়ে যাচ্ছে অতীত, ভবিষ্যৎ হচ্ছে বর্তমান।

বুদ্ধের মতে জগতের সমস্ত বস্তুই কার্যকারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ-কারণ নিরপেক্ষ কোনো জিনিস নেই। কোনো বস্তু স্বয়ং উৎপন্ন হয় না, একটি ঘটনা আর একটি ঘটনা থেকে সঞ্জাত। সবকিছুই সমুৎপাদ বা উৎপত্তি লাভ করে পূর্বের ঘটনা থেকে। বৌদ্ধদর্শনে এই তত্ত¡কেই বলা হয় ‘প্রতীত্য-সমুৎপাদ’। এই তত্ত্বানুসারে মানুষের (১) দুঃখের কারন জরা-মরণ, (২) তার কারণ জাতি বা জন্ম, (৩) তার কারণ ভব, (৪) তার কারণ উপাদান, (৫) তার কারণ তৃষ্ণা, (৬) তার কারণ বেদনা, (৭) তার কারণ স্পর্শ, (৮) তার কারণ ষড়ায়তন, (৯) তার কারণ নাম-রূপ, (১০) তার কারণ বিজ্ঞান, (১১) তার কারণ সংষ্কার এবং (১২) সংষ্কারের কারণ অবিদ্যা। এই অবিদ্যা নাশ হলে সংষ্কার থেকে আরম্ভ করে একে একে দুঃখের বিনাশ ঘটে। এই অবিদ্যা হচ্ছে চারটি আর্যসত্য সম্বন্ধে অজ্ঞতা (১) দুঃখ আছে (২) দুঃখের কারণ আছে (৩) দুঃখের নিবৃত্তি আছে এবং (৪) দুঃখ নিবৃত্তির উপায়ই বিখ্যাত অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামে পরিচিত।

বুদ্ধের জীবনের লক্ষ্য ছিল দুঃখ থেকে অব্যাহতি বা নির্বাণলাভ। এই পথ উদ্ভাবন করতে গিয়ে তিনি জগৎ সম্বন্ধে পরিবর্তনশীলতার যে মতবাদ ব্যক্ত করেছেন তাঁর দর্শন হয়েছে সম্পূর্ণরূপে ডাইলেকটিক্যাল। ইউরোপীয় দার্শনিকদের বৌদ্ধদর্শনের সঙ্গে পরিচয় না থাকার ফলেই গ্রিস দার্শনিক হেরাক্লিটাসকে এর আবিষ্কারক বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধ এই সত্যটির প্রথম আবিষ্কারক। বুদ্ধ ছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গলসের মতো বস্তুবাদী। কিন্তু বুদ্ধত্ব লাভের পর নিজের মতবাদ প্রচার ও সংঘের কাজে ব্যাপৃত থাকয় বুদ্ধ এ দর্শনের প্রতি বিশেষ কোনো দৃষ্টিই দেননি যেমন মার্ক্স ‘পুঁজি’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা এবং অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকায় ডাইলেকটিক্যাল বস্তুবাদ সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে কোনো গ্রন্থ রচনা করা সম্ভবপর হয়নি। তবে মার্ক্সবাদ যেমন এঙ্গেলস, লেলিন ও ষ্ট্যালিনের হতে পূর্ণতা লাভ করে ঠিক তেমনি নাগসেন, বুদ্ধঘোষ, নাগার্জুন প্রমুখ বৌদ্ধ দার্শনিকদের হাতে বুদ্ধের ডাইলেকটিক্যাল বস্তুবাদী চিন্তাধারার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।

 

বুদ্ধদেব-প্রসঙ্গ


বিশেষ স্থানে গিয়ে, বিশেষ মন্ত্র প’ড়ে, বিশেষ অনুষ্ঠান করে মুক্তিলাভ করা যায়, এই বিশ্বাসের অরণ্যে যখন মানুষ পথ হারিয়েছিলো তখন বুদ্ধদেব এই অত্যন্ত সহজ কথাটি আবিষ্কার ও প্রচার করবার জন্যে এসেছিলেন যে, স্বার্থত্যাগ করে, সর্বভূতে দয়া বিস্তার করে, অন্তর থেকে বাসনাকে ক্ষয় করে ফেললে তবেই মুক্তি হয়; কোনো স্থানে গেলে, বা জলে স্নান করলে, বা অগ্নিতে আহুতি দিলে, বা মন্ত্র উচ্চারণ করলে হয় না। এই কথাটি শুনতে নিতান্তই সরল, কিন্তু এই কথাটির জন্যে একজন রাজপুত্রকে রাজ্যত্যাগ করে বনে বনে, পথে পথে, ফিরতে হয়েছে।
৭ পৌষ ১৩১৬


বুদ্ধদেব যে দুঃখনিবৃত্তির পথ দেখিয়ে দিয়েছেন সে পথের একটা সকলের চেয়ে বড়ো আকর্ষণ কী? সে এই যে, অত্যন্ত দুঃখ স্বীকার করে এই পথে অগ্রসর হতে হয়। এই দুঃখ স্বীকারের দ্বারা মানুষ আপনাকে বড়ো করে জানে। খুব বড়ো রকম করে ত্যাগ, খুব বড়ো রকম করে ব্রতপালনের মাহাত্ম্য মানুষের শক্তিকে বড়ো করে দেখায় বলে মানুষের মন তাতে ধাবিত হয়।
১৪ চৈত্র ১৩১৫


বুদ্ধদেব যখন বেদনাপুর্ণচিত্তে ধ্যান দ্বারা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন যে, মানুষের বন্ধন বিকার বিনাশ কেন, দুঃখ জরা মৃত্যু কেন, তখন তিনি কোন উত্তর পেয়ে আনন্দিত হয়ে উঠেছিলেন? তখন তিনি এই উত্তরই পেয়েছিলেন যে, মানুষ আত্মাকে উপলব্দি করলেই, আত্মাকে প্রকাশ করলেই, মুক্তিলাভ করবে। সেই প্রকাশের বাধাতেই তার দুঃখ, সেইখানেই তার পাপ। এইজন্যে তিনি প্রথমে কতকগুলি নিষেধ স্বীকার করিয়ে মানুষকে শীল গ্রহণ করতে আদেশ করেন। তাকে বললেন, ‘তুমি লোভ কোরো না, হিংসা কোরো না, বিলাসে আসক্ত হোয়ো না।’ যে সমস্ত আবরণ তাকে বেষ্টন করে ধরেছে সেইগুলি প্রতিদিনের নিয়ত অভ্যাসে মোচন করে ফেলবার জন্যে তাকে উপদেশ দিলেন। সেই আবরণগুলি মোচন হলেই আত্মা আপনার বিশুদ্ধ স্বরূপটি লাভ করবে। সেই স্বরূপটি কী? শূন্যতা নয়, নৈষ্কর্ম্য নয়। সে হচ্ছে মৈত্রী, করুণা, নিখিলের প্রতি প্রেম। বুদ্ধ কেবল বাসনা ত্যাগ করতে বলেন নি, তিনি প্রেমকে বিস্তার করতে বলেছেন। কারণ, এই প্রেমকে বিস্তারের দ্বারাই আত্মা আপন স্বরূপকে পায়। সূর্য যেমন আলোককে বিকীর্ণ করার দ্বারাই আপনার স্বভাবকে পায়।


বুদ্ধদেব শূন্যকে মানতেন কি পূর্ণকে মানতেন সে তর্কের মধ্যে যেতে চাই নে। কিন্তু তিনি মঙ্গলসাধনার দ্বারা প্রেমকে বিশ্বচরাচরে মুক্ত করতে উপদেশ দিয়েছিলেন। তাঁর মুক্তির সাধনাই ছিল স্বার্থত্যাগ অহংকারত্যাগ ক্রোধত্যাগের সাধনা, ক্ষমার সাধনা, দয়ার সাধনা, প্রেমের সাধনা। এমনি করে প্রেম যখন অহং-এর শাসন অতিক্রম করে বিশে^র মধ্যে অনন্তের মধ্যে মুক্ত হয় তখন সে যা পায় তাকে যে নামই দাও না কেন সে কেবল ভাষার বৈচিত্র মাত্র, কিন্তু সেই-ই মুক্তি। এই প্রেম যা যেখানে আছে কিছুকেই ত্যাগ করে না; সমস্তকেই সত্যময় করে, পূর্ণতম করে, পূর্ণতম করে উপলব্দি করে। নিজেকে পূর্ণের মধ্যে সমর্পণ করবার কোনো বাধাই মানে না।
৭ বৈশাখ ১৩১৬


বুদ্ধদেবের আসল কথাটা কী সেটা দেখতে গেলে তাঁর শিক্ষার মধ্যে যে অংশটা নেগেটিভ সে দিকে দৃষ্টি দিলে চলবে না, যে অংশ পজিটিভ সেইখানেই তাঁর আসল পরিচয়। যদি দুঃখ-দূরই চরম কথা হয় তা হলে বাসনা-লোপের দ্বারা অস্তিত্বলোপ করে দিলেই সংক্ষেপে কাজ শেষ হয় কিন্তু মৈত্রীভাবনা কেন? মৃত্যুদন্ডই যার উপর বিধান তার আর ভালোবাসা কেন, দয়া কেন? এর থেকে বোঝা যায় যে, এই ভালোবাসাটার দিকেই আসল লক্ষ্য- আমাদের অহং, আমাদের বাসনা স্বার্থের দিকে টানে বিশুদ্ধ প্রেমের দিকে, আনন্দের দিকে নয় এইজন্যই অহংকে নির্বাপিত করে দিলেই সহজেই সেই আনন্দলোক পাওয়া যাবে। আমার “পূর্ণিমা” বলে ‘চিত্রা’র একটা কবিতা পড়েছ? তাতে আছে, একদিন সন্ধ্যার সময় বোটে বসে সৌন্দর্যতত্ত্ব সম্বন্ধে একটি ইংরেজী বই পড়তে পড়তে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে যেমনি বাতি নিভিয়ে দিলুম অমনি দেখি নৌকায় সমস্ত জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার ধারা এসে আমার কক্ষ প্লাবিত করে দিল। ঐ ছোট্ট একটি বাতি আমার টেবিলে জ্বলছিল বলে আকাশ-ভরা জ্যোৎস্না আমার ঘরে প্রবেশ করতেই পারে নি বাইরে যে এত অজস্র সৌন্দর্য দ্যুলোক ভূলোক আছন্ন করে অপেক্ষা করছিল তা আমি জানতেও পারি নি। অহং আমাদের সেইরকম জিনিস-অত্যন্ত কাছে এই জিনিসটা আমাদের সমস্ত বোধশক্তিকে চার দিক থেকে এমনি আবৃত করে রেখেছে যে অনন্ত-আকাশ-ভরা অজস্র আনন্দ আমরা বোধ করতেই পারছি নে, এই অহংটার যেমনি নির্বাণ হবে অমনি অনির্বচনীয় আনন্দ এক মুহূর্তে আমাদের কাছে পরিপূর্ণরূপে প্রত্যক্ষ হবেন। সেই আনন্দই যে বুদ্ধদেবের লক্ষ্য তা বোঝা যায় যখন দেখি তিনি লোকলোকান্তরের জীবের প্রতি মৈত্রী বিস্তার করতে বলছেন। জগতে যে অনন্ত আনন্দ বিরাজমান তারও যে ঐ প্রকৃতি। সে যে যেখানে যা-কিছু আছে সমস্তর প্রতি অপরিমেয় প্রেম। এই জগত্ব্যাপী প্রেমকে সত্যরূপে লাভ করতে গেলে নিজের অহংকে নির্বাপিত করতে হয়, এই শিক্ষা দিতেই বুদ্ধদেব অবতীর্ণ হয়েছিলেন নইলে মানুষ বিশুদ্ধ আত্মহত্যার তত্ত্বকথা শোনবার জন্য কখনেই তাঁর চার দিকে ভিড় করে আসত না।
৯ জৈষ্ঠ ১৩১৮


বৌদ্ধধর্ম বিষয়াসক্তির ধর্ম নহে, এ কথা সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে। অথচ ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের অভ্যুদয়কালে এবং তৎপরবর্তী যুগে সেই বৌদ্ধসভ্যতার প্রভাবে এ দেশে শিল্প বিজ্ঞান বাণিজ্য এবং সাম্রাজ্যশক্তির যেমন বিস্তার হইয়াছিল এমন আর কোনো কালে হয় নাই। তাহর কারণ এই, মানুষের আত্মা যখন জড়ত্বের বন্ধন হইতে মুক্ত হয় তখনি আনন্দে তাহার সকল শক্তিই পূর্ণ বিকাশের দিকে উদ্যম লাভ করে। আধ্যাত্মিকতাই মানুষের সকল শক্তির কেন্দ্রগত, কেননা তাহা আত্মারই শক্তি; পরিপূর্ণতাই তাহার স্বভাব্ তাহা অন্তর বাহির কোনো দিকেই মানুষকে খর্ব করিয়া আপনাকে আঘাত করিতে চাহে না।
১৩১৯


একদিন বুদ্ধ বললেন, আমি সমস্ত মানুষের দুঃখ দূর করব। দুঃখ তিনি সত্যিই দূর করতে পেরেছিলেন কিনা সেটি বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হচ্ছে তিনি এটি ইচ্ছা করেছিলেন, সমস্ত জীবের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। ভারতবর্ষ ধনী হোক, প্রবল হোক, এ তাঁর তপস্যা ছিল না; সমস্ত মানুষের জন্য তিনি সাধনা করেছিলেন। আজ ভারতের মাটিতে আবার সেই সাধনা জেগে উঠুক, সেই ইচ্ছাকে ভারতবর্ষ থেকে কি দূর করে দেওয়া চলে!
১৭ ভাদ্র ১৩৩১

সংকলন: (১) নীরুকুমার চাকমা, ‘বুদ্ধ: ধর্ম ও দর্শন’(তৃতীয় সংস্করণ, ২০১৮, অবসর), বৌদ্ধদর্শন ও ডাইলেকটিক্যাল বস্তুবাদ, ৪৫।
(২) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘বুদ্ধদেব’ (প্রথম প্রকাশ ২০০১, বাঙলা), বুদ্ধদেব প্রসঙ্গ, ২৬।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

পৃথিবীর পথে গন্তব্যহীন পরিব্রাজক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।