ছবি : ঢাকা ট্রিবিউন

জর্জ ফ্লয়েড : বর্ণ বৈষম্য ও নিপীড়িত মানুষের আর্তচিৎকার

()

কালো আর সাদা বাহিরে কেবল, ভেতরে সবার সমান রাঙা- মানুষ জাতি কবিতায় মানুষের ভেদাভেদ দূর করে সবমানুষকে সমান বানিয়েছেন। বর্ণবাদ শব্দটি দ্বারা মূলত শরীরের রং দ্বারা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বুঝায়। সেই অতীত কাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সমাজেও বর্ণবাদ আমাদের অস্থিমজ্জায় গেথে আছে। আমরা সম্ভবত এই বর্ণবাদের বিষয়টি পুরোপুরি দূর করতে চাই না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে নতুন করে বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন অগ্নিগর্ভ। বিক্ষোভ আর আন্দোলনে উত্তাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শতশত বছর ধরে চলা এই বর্ণ বৈষম্যের কোথায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই বৈষম্য প্রবাহিত হচ্ছে। আধুনিক সমাজের মানুষেরাও বর্ণবৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়! জর্জ ফ্লয়েডের ঘটনায় ওয়াশিংটন পোষ্টের এক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজার ১৪ জন পুলিশের হাতে খুন হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে শে^তাঙ্গের তুলনায় তিন গণ বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মারা যান। সাদা চামড়া কালো চামড়া নিয়ে সারা পৃথিবীতেই এক অদ্ভূত বৈষম্য চালু ছিল একসময়। কালো চামড়ার লোকদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রভু আর ভৃত্যেও সম্পর্ক ছিল কেবল গায়ের রংয়ের ওপর ভিত্তি করে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে উপন্যাস,সিনেমা। নেলসন ম্যান্ডেলা নামটি আজ সবার কাছে পরিচিত। তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন এই বর্ণবাদেও বিরুদ্ধে। তার জন্য তাকে কম যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়নি। অদ্ভূত সব বৈষম্যে ভরা এই সমাজটা। এখানে চামড়ার রঙে বৈষম্য, জাতিতে জাতিতে বৈষম্য, গোত্রে গোত্রে বৈষম্য, আকারে বৈষম্য,আর্থিক ক্ষমতায় বৈষম্য এরকম আরও বহু বৈষম্য আমাদের এই সুন্দর ধরণীতে। অথচ কি আশ্চর্য মিল সবার মধ্যে! সবাই এই পৃথিবী নামক গ্রহটির মানুষ বলে পরিচয় দেই। আমাদের সবার দেহ একই রকম উপাদানে গঠিত, রক্তের রং লাল, খাদ্য খেয়ে সবাই জীবন ধারণ করি, গঠন প্রকৃতিও এক। তবু আমরা বৈষম্য করি, নিজেদের আলাদা করে চেনানোর চেষ্টা করি, নিজেদের বিরত্ব জাহির করি।

উইকিপিডিয়ায় দেখা যায় বর্ণবাদ সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে, বর্ণবাদ সেই দৃষ্টিভঙ্গি, চর্চা এবং ক্রিয়াকলাপ যেখানে বিশ^াস করা হয় যে মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবেই অনেকগুলো গোষ্ঠীতে বিভক্ত এবং একইসাথে বিশ্বাস করা হয় কোন কোন গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য উঁচু অথবা নিচু; কিংবা তার উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী অথবা বেশি যোগ্য কিংবা অযোগ্য। তবে বর্ণবাদের সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করাটা কঠিন। কারণ গবেষকদের মধ্যে গোষ্ঠী ধারনাটি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। বর্ণবাদ কখনো গায়ের রং, কখোনো আঞ্চলিকতা আবার কখোনো গোত্র নিয়ে বোঝানো হয়ে থাকে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত নেতা ও আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্যতম নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। যে মানুষটি এই বৈষম্য দূর করতে বহু নির্যাতন সহ্য করেছেন। তার দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরুপ দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটে এবং সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে ১৯৯৪ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ শেষ হয়। কিন্তু তার পরেও আদৌ আজকের পৃথিবীতে তা শেষ হয়েছে কি। আমাদের দেশে প্রায় দুশ বছর ব্রিটিশরা শাসন করেছে। সাদা চামড়ার সাহেব বাবুরা বাঙালিদের খুব একটা আপন করতে পারেনি। একটা দুরত্ব ছিল কেবল চামড়ার রংয়ের আর ভাষার কারণে। আজও ফর্সা কালোর সামাজিক পার্থক্য শেষ হয়ে যায়নি। বরং আধুনিক হওয়ার সাথে সাথে তা আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। কালো হওয়ার দায় যেন ব্যক্তির নিজস্ব আর ফর্সা হওয়ার কর্তৃত্ব যেন সবটুকুই তার।

ছবি : কলকাতা 24/7

যদিও কাগজে কলমে এই দুইয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য চোখে পরে না। কোন ভেদাভেদ নেই। আমরা মুখে মুখে বর্ণ বৈষম্য নেই নেই বলে চিৎকার করি। নিজেদের আধুনিক বলে দাবি করি। যদি তাই হতো তাহলে আজকের সমাজে এতটা ভেদাভেদ থাকতো না। উঁচু নিচু থাকতো না। গোত্রে গোত্রে হানাহানি থাকতো না। বর্ণে বর্ণে প্রথায় এত ঘৃণা বিদ্বেষ থাকতো না। কিন্তু সমাজে আজও আমাদের অন্তরে তা আছে বলেই এত অন্যায় এত অশান্তির আগুন। স্বাভাবিক দৃৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশে বর্ণবাদ নেই। গায়ের রং দিয়ে কাউকে ছোট বা বড় করার সুযোগ নেই। তবুও বর্ণবাদের রেখা আছে আমাদের পরিবারে,সমাজে বা টিভির বিজ্ঞাপনে। টিভিতে সারাদিন রং ফর্সা করার ক্রিমের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপনের বাইরেও বহু পণ্য রয়েছে যেগুলো রীতিমত বিফলে মূল্য ফেরতের গ্যারান্টি দিয়ে রং ফর্সা করার ক্রীম বিক্রি করছে। তাও আবার নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে। একটু খোঁজ করলে আমাদের আশেপাশের দোকানেই এসব পণ্য মেলে। যদি সাদা কালো কোন বিভেদ নাই থাকতো তাহলে ফর্সা হওয়ার বা করার এত তোড়জোড় কিসের? আসলে আমরা সমান কথাটা কেবল মুখেই বলি। অন্তরে লালন করি না। তাই মেয়েকে ফর্সা বানানোর প্রাণান্ত চেষ্টা থাকে মা বাবার। কালো মেয়ে কোল জুড়ে আসলে পরিবারের দুশ্চিন্তা হয় না এমন পরিবার আজকের যুগেও অনেক কম আছে।

মেয়েকে শিক্ষিত করে বড় করে তোলার চেয়ে ফর্সা করা বড় হয়ে দাড়ায়। এর যথেষ্ট কারণও আছে। ছেলের বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ছেলের বউটা ফর্সাই আনতে চায় অধিকাংশ পরিবার। সেক্ষেত্রে যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সেও কিন্তু একজন মেয়ে। যার নিজের গায়ের রং হয়তো কালো সে নিজে উঠে পরে লাগে একটা ফর্সা ভবিষ্যত বংশধর বানাতে! ভাবা যায়! এমন কিছু চাকরির বিজ্ঞাপন দেখি যেখানে সুন্দর আকর্ষনীয় হওয়া বাঞ্চনীয়। আমাকে নিশ্চয়ই পদের নাম বলতে হবে না। মানে চেহারা সুন্দর না হলে সে পদে আবেদনই করতে পারবে না। চারদিকে কেবল বৈষম্য আর বৈষম্য। ফর্সা মানেই সুন্দর আর কালো মানেই অসুন্দর। ফর্সা ছেলেমেয়ে হলেই চাঁদের মত সুন্দর আর কালো হলেই ভ্রæটা একটু কুঁচকে যায়। আমরা যতই জোর গলায় চিৎকার করি না কেন কোন লাভ নেই। কারণ মন থেকে যতদিন সাম্য না আনবো ততদিন কোন লাভ হবে না। রবীন্দ্রনাথের গানের কৃষ্ণকলি কেবল গানেই সুন্দর বাস্তবে তার উপস্থিতি ততটাই ক্ষীণ। কৃষ্ণকলিদের মর্যাদা আমাদের সমাজে নেই। তারাও কৃষ্ণকলি থেকে উত্তরোণের জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে যায়। ক্রীমের পর ক্রীম, নানা ভেষজ আরও কত কি থাকে! বর্ণবাদ বহু আগেই শেষ হয়েছে বলে আমরা গলা ফাটিয়ে বলি আসলে তা শেষ হয়নি। বর্ণবাদ ছিল এবং আজও আছে নতুন রুপে। ক্ষেত্রবিশেষে আরও প্রকট। বর্ণবাদের এই জুজু কোনদিনই শেষ হবে না যতদিন আমরা নিজেরা না বদলাবো। ১৯৬৭ সালে বর্ণবাদ বিরোধী কিংবদন্তী নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, বিক্ষোভ সংঘর্ষ হলো নিপীড়িতের ভাষা, যাদের কথা কেউ শোনে না।

লেখক: অলোক আচার্য, সাংবাদিক। 

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার অতিথি লেখক

অতিথি লেখকদের ব্লগপোষ্ট এই একাউন্ট থেকে প্রকাশিত হবে

একটি মন্তব্য

  1. আমাদের চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন জরুরি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।