ড. সলিমুল্লাহ খানের ‘আদমবোমা’ : সময় তুমি তো অর্থ নও, তবুও কেন দ্রুত ফুরিয়ে যাও

()

ড. সলিমুল্লাহ খানের ‘আদম বোমা’ পড়া শুরু করেছি অনেক দিন হলো। বেহাত বিপ্লব, আমি তুমি সে, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী, প্রার্থনা, ফ্রয়েড পড়ার ভূমিকা, বাংলাদেশ জাতীয় অবস্থার চালচিত্র, স্বাধীনতা ব্যবসায় ইত্যাদিও ফাঁকে ফাঁকে পড়া হচ্ছে। যতই পড়ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি- জনাব সলিমুল্লাহ খানের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের গভীরতা আমাকে চুম্বকের মতো টেনে ধরে। আমি নিজেও সমৃদ্ধ হচ্ছি তার সেই গভীর চৈতন্যে। জগতের সমগ্র বিশালতাকে অনুধাবন করে তার সরূপ বুকে ধারণ করে ব্যাখা করা কি যে কঠিন তা সেই বুঝতে পারে, যে সত্য ও মহত্ত্বের প্রশ্নে দায়বদ্ধ। ড. সলিমুল্লাহ খান সত্যকে খোঁজে বেড়ান আর মহত্ত্বের প্রশ্নে তিনি থাকেন আপসহীন। জগতের ধুরন্দর বুদ্ধি ব্যবসায়ীদের জঘন্য মনোবৃত্তিকে আমাদের সামনে উপস্থিত করেন উত্তর ঔপনিবেশিক বেদনায়। পৃথিবীর বড় বড় সূর্য সন্তান’রা কি রকম জঘন্যতায় মানব মহত্ত্বকে তছনছ করেছে, রক্তাক্ত করেছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তা অনুধাবন করে তিনি বিশ্লেষণ করেন মানিবক মহত্ত্ব। তার বিশ্লেষণ এত নান্দনিক এত ধারালো গোলাপের সুরভি যেন ঝরে পড়ে প্রত্যেকটি চিন্তা থেকে। আমি সেই সুরভির ঘ্রাণে মুগ্ধ হই, আলোড়িত হই- জগতের তিনভাগ জলে সাঁতার কাটি একভাগ স্থলে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটি। আমার সামনে অন্ধকার থাকে না আলো এসে সকালটা উজ্জ্বল করে দেয়। আমি সূর্যের আলোয় যেমন স্নাত হই, তার চেয়ে বেশি কি স্নাত হই না সলিমুল্লাহ খানের জ্ঞানের আলোয়! তার প্রত্যেকটি বই একটি বই নয় হাজারটা বইয়ের নির্যাস। সেখানে কালো অক্ষরে আলোর উজ্জ্বল উদ্ধার। আলিফ, বা, তা সত্য হয়ে, স্বপ্ন হয়ে উড়ে। উড়ে উড়ে পাখি হয়ে যায়। মানুষ পাখির ভাষা বুঝে না। কিন্তু পাখির ভাষার স্বর কোনটা কর্কশ কোনটা মধুর তান বুঝতে পারে।

এই বুঝতে পারাটাই মানুষের চৈতন্য। সলিমুল্লাহ খান যে ভাষা নির্মণ করছেন তা যে কর্কশ না মধুর তান সেটা কি আমরা বুঝতে পারি না? বুঝতে পেরেও তার ভাষা নিয়ে আমাদের টানাটানি করতে হচ্ছে কেন, আমি বুঝি না। আমি বলবো এ সলিমুল্লাহ খানকে হয় সজ্ঞানে অবহেলা করা, নয় তার জ্ঞানের চৈতন্যের ভাষাকে বুঝতে না পারা। বলবো শাহবাগ কেন্দ্রিকতা বা পুরো বাংলাদেশ সলিমুল্লাহ খানের জানার পরিধি, জ্ঞানের পরিধির কাছে শিশু হয়ে আছে বলেই তার প্রজ্ঞাকে বুঝতে পারে না। বাংলাদেশের ঈর্ষা কাতর লেখক কবি সাহিত্যিকরা নিজেদের কি মনে করেন জানি না। একটি জাতির লেখক কবি শিল্পী হতে হলে কতটা দায়িত্ব নিয়ে সাধনা করতে হয়, কতটা দায়বদ্ধ হতে হয় তা সলিমুল্লাহ খানকে দেখে শিখতে হবে। তার কথার ‘হেকমত’ বুঝে শিখতে হবে। কেন তিনি এ কথা বলছেন বা লিখছেন। পৃুরো জগতটাই যদি ধুরন্দর, ধুন্ধমার হৃদয়হীন লেখক কবি শিল্পী বণিক আমলা রাজনীতিক বুদ্ধিজীবী সামরিক আধা সামরিক বাহিনি ভাগ করে নিয়ে ভাগ ভাটোয়ারা করার জন্য উদ্ধত ভঙ্গিতে জগত দখল করে রাখে, সেখানে একজন সত্যিকারের লেখক তার বেদনার কথা বলবে- লিখবেই। সবাই স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে কেউ দিয়েছে কবিতার দোকান, কেউ দিয়েছে চলচ্চিত্রের দোকান, কেউ থিয়েটারের, কেউ সরকারি প্রতিষ্ঠানের, কেউ কর্পোরেটোক্রেসি দোকান নিয়ে জগত লুটপাঠ করছে। যারা আবার দেবতার সম্মানও নিচ্ছে পৃথিবীর সাধারণ অবুঝ গরীব নিরীহ শ্রমজীবী মানুষগুলো থেকে। সেই সত্যটা তুলে ধরছেন ড. সলিমুল্লাহ খান। জগতের তিনভাগ জল সেঁচে জ্ঞান আহরণ করা কি এত সহজ! তার জন্য কত নিবেদন করতে হয়। কত রাত কত দিন -জলের মত ঘুরে ঘুরে একা কথা কইতে হয়, সেই জানে যে সেই সাধনা করে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদ সংকলন করতে গিয়ে কি সাধনাটা না করেছেন তা যদি জানা থাকে তাহলে যে কেউ বুঝতে পারবে সাধনার মর্ম। শত বছরের সেই আশ্রম জীবন কি ।

জ্ঞানের শ্রম ও আশ্রম জীবন যদি আবার পাওয়া যেত তাহলে সলিমুল্লাহ খানও নতুন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বলতে পারতাম। যে দ্বৈপায়ন মানুষের মহত্ত্ব ও সত্যের জন্য দীর্ঘ জীবন সাধনায় কাটিয়ে দিয়েছেন। ‘আদমবোমা’ বাঙলা ভাষায় রচিত ড. সলিমুল্লাহ খানের মৌলিক চিন্তার একটি ধ্রপদী চিন্তার বই। বিশ্ব জ্ঞানকে মন্থন করে তিনি এটি বাঙলা ভাষায় রচনা করেছেন। বিশ্বের অপরাপর জ্ঞানীদের চিন্তার শয়তানীতে পৃথিবী কিভাবে টালমাটাল হয়েছে , অসহায় হয়ে পড়েছে সে সব তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। সে এক বিরাট বিশ্ব। আমাদের অজনা বিশ্ব। সে লেখাগুলো পড়তে পড়তে আমার মনে হয় হায়! সময় তুমি তো অর্থ নও, তবুও কেন এত দ্রুত ফুরিয়ে যাও। মানুষকে কেন টেনে নিয়ে যাও সময়ের অন্তিমে। আমি আরও বেশি করে জগতকে জানতে চাই। জগতে যারা স্ব নামে নিজেদের বিভূষিত করেছেন, খ্যাত করেছেন তারা জেনে-বুঝে পৃথিবীর কত ক্ষতি করেছেন তা মহত্ত্বের নামে সত্য ধর্মের নামে চালিয়ে দিয়েছেন তাকেই তিনি শুধু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন না, বলতে পারি বাঙলা ভাষাভাষী মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। ‘আদমবোমা’য় নানা স্বাদের নানা বোধির ১৮টি প্রবন্ধ স্থান দিয়েছেন। এই প্রবন্ধ গুলোকে নানা ভাগে ভাগ করে পরিবেশন করা হয়েছে। প্রত্যেকটি প্রবন্ধই আপনাকে এক একটি জগতে নিয়ে যাবে, চিন্তা করতে উসকে দেবে। জগত কে আপনি এতদিন ধরে যেভাবে দেখেছেন জগত যে সে রকম নয় অন্যরকম তা বুঝতে পারবেন। কারা জগতকে জিম্মি করে রেখেছে, কারা কর্তৃত্ব ও ধর্মের বলে মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে দমিয়ে রাখার জন্য সুদূরপসারী পরিকল্পনা নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে অস্ত্র, জ্ঞানের অস্ত্র, তলোয়ার শান দিয়ে দিয়ে আর তাতে তা দিয়ে মানুষের গলা কেটেছে।

সে সব বিষয়কে যুক্তি সত্য সাধনায় রেখে সলিমুল্লাহ খান তার যৌক্তিক ব্যাখা হাজির করেছেন। তার ভাষার অসাধারণ মুন্সিয়ানা । পাণ্ডিত্যে গর্ব করার মত সৌন্দর্য সব পাঠক না হলেও সমঝদার পাঠককে মুগ্ধ করবেই। তার বইয়ের পরিকল্পনাও অসাধারণ। যেমন ‘ প্রবেশিকায়- প্রভুর অর্থ ভৃত্যের প্রার্থনা, পূর্বাভাস- স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা। এরপর বইয়ের আসল ট্রপিক ‘আদমবোমা’ দিয়ে শুরু- আদমবোমা : পশ্চিমা সাম্রাজ্যের বর্ণপরিচয়, আদমবোমা : আত্মহত্যা না সত্যগ্রহ, আদমবোমা না স্বাধীনতা-ব্যবসায় সাম্রাজ্যবাদের যুগে দুই বিশ্বের কবিতা, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য- আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধের আগাম ফলাফল, অন্যায় ও ন্যায়যুদ্ধ, না ক্রসেড না জেহাদ, সাম্রাজ্য ও সংস্কৃতি- আধুনিক ও উত্তরাধুনিক, এডায়ার্ড সায়িদের ‘প্রাচ্যব্যবসায়’ বিষয় সাম্রাজ্যবাদের বিদ্যাবুদ্ধি, এডায়ার্ড সায়িদ, এসলাম ও সস্ত্রাসবাদ, কঙ্করবোমা- ফ্রয়েড, এর্ডোয়ার্ড সায়িদ, এয়ুরোপের বিজাতি কাব্রালনামা : প্রাণ, পরিচয় ও ইজ্জত, আপন ও পর বুদ্ধিজীবী, সত্যের প্রয়োগ- ভারতে পরমাণু বোমা ও মহত্মা গান্ধি, স্যার বিদিয়াধর সুরজপ্রসাদ নাইপলের অখণ্ড ভারত, একবাল আহমদের ১৯৭১, সংবর্ধনা – শার্ল বোদলেয়ার : হাাবিল ও কাবিল, শামসুর রাহমান : স্যামসন, হাসান ফেরদৌউস : নাইপলের পাকিস্তান, আহমদ ছফা : কবি ফররুখ আহমদের কি অপরাধ? কুরিহারা সাদাকো : কালো আণ্ডা। বোধিনী, দোহাই। মনির ইউসুফ-আলোচনা (প্রথম ভাগ)।

সলিমুল্লাহ খান সুক্ষ্ম আলোচনা এত গভীর গভীরতরো যে সহজে এই প্রবন্ধগুলোর ব্যাপকতা ধরতে পারা সহজ নয়। , জগতের জ্ঞানের অনুসন্ধিৎসু পাঠক না হলে তাঁর ভাষার ধরণ বুঝতে পারাও কঠিন হবে বলে মনে করি। ‘আদমবোমা’ পশ্চিমা সাম্রাজ্যের বর্ণ পরিচয় প্রবন্ধটিতে ‘তালাল আসাদ’ কে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আমার জানি ‘তালাল আসাদ’ এই সময়ের পশ্চিমা জ্ঞানের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে ‍দিয়ে সত্য সুন্দর মহৎ জ্ঞানকে তুলে ধরছেন। পশ্চিমাদের ভূত ভবিষ্যতকে আমাদের সামনে তুলে ধরে জগতের সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রভূত সহযোগিতা করছেন। আমরা জানি তালাল আসাদের বাবা মুহাম্মদ আসাদ ‘রোড টু মক্কা’ নামে একটি অসাধারণ বই লিখে পশ্চিমা বিশ্বকে তোলপাড় করে দেন। এক সময়ের ইহুদী পরিবার পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ্যাকে নগ্নভাবে উন্মোচন করে সত্যের সন্ধ্যানে নিজেদের কর্মে ব্যাপৃত করেন। সলিমুল্লাহ খান তার সাধনার গভীর বোধে ইউরোপ আফ্রিকা এশিয়া বা ভারতের যে মনীষীগুলো মানুষের সঙ্গে ঈমানদারীর নামে বেঈমানি করেছেন তাদের মুখোশ আমাদের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছেন। আর যারা সত্য সত্য মানুষের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের সত্যকে আমাদের সামনে হাজির করেছেন। জনাব সলিমুল্লাহ খানের এসব লেখা নিয়ে তর্ক করতে পারেন কিন্তু অস্বীকার করার কোন জো নেই।

আমার পাঠের ভেতর হৃদয়ের ভেতর মস্তিষ্কের অনুরণনে এই অক্ষর গেঁথে থাকে। আমি একবার না বারবার পড়ি। পড়ে পড়ে নিজেকে সানাই। হজের সময় হাজীদের শয়তানের প্রতি কেন ‘কঙ্করবোমা’ নিক্ষেপ করা বাধ্যতামূলক একটি নিয়মে পরিণিত করা হয়েছে তা নিয়ে ভাবতে থাকি ভাবতে থাকি। আর নিজেকে নিজে বলতে থাকি ‘সময় তুমি তো অর্থ নও তবুও কেন এত দ্রতি ফুরিয়ে যাও।

ইতিহাস কারখানা ২
আদমবোমা- সলিমুল্লাহ খান, আগামী প্রকাশনী, এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, সম্পাদক-আবুল খায়ের মুহাম্মদ আতিকুজ্জামান, সহকারী সম্পাদক : সুরাইয়া জান্নাত সুমি, তানিয়া সুলতানা, সুমণ আরেফিন
মূল্য : পাঁচশত টাকামাত্র

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার মনির ইউসুফ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।