তারাপদ রায়ের সেরা তিনটি হাসির গল্প

()

হাসি মানসিক বৈকল্যতার অন্যতম ঔষধ। সুস্থ থাকতে সুঠাম দেহের পাশাপাশি সুস্থ হাসির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই আজকের এই সংকলনের প্রয়াস। অবিভক্ত বাংলার অন্যতম শক্তিমান লেখক তারাপদ রায়ের আছে শক্ত এক হাসির গল্প সংকলন। বাস্তবিক অর্থে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তারাপদ রায়ের হাসির গল্পগুলো। মন খারাপ থাকলে তারাপদ রায়ের কান্ডজ্ঞানহীন, মাতাল সমগ্র, রম্যরচনায় ডুব দিই। তারাপদ রায়ের রম্যরচনা ও মাতাল সমগ্র থেকে পছন্দের তিনটি গল্প এখানে সংকলিত করলাম। পেট ভরে হাসুন, ভালো লাগুক মনে।

 

ছাতা

প্রিয় মেঘনাদবাবু,
গত শনিবার রাতে খুব বৃষ্টির সময় আমাদের বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য আমাদের চাকর পাশের বাড়ি থেকে যে ছাতাটি আপনাকে চেয়ে এনে দিয়েছিল সেই ছাতাটি পাশের বাড়ির ভদ্রলোক আজ চাইতে এসেছিলেন। ভদ্রলোক বললেন, ছাতাটি তিনি তাঁর অফিসের বড়বাবুর কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন, বড়বাবুকে বড়বাবুর ভায়রাভাই খুব চাপ দিচ্ছেন ছাতাটির জন্য, কারণ বড়বাবুর ভায়রাভাই যে বন্ধুর কাছ থেকে ছাতাটি আনেন সেই বন্ধুর মামা তাঁর ছাতাটি ফেরত চাইছেন।
দয়া করে কিছু মনে করবেন না। … ছাতাটি পত্রবাহকের হাতে ফেরত দিয়ে বাধিত করবেন। … এইমাত্র পাশের বাড়ির ভদ্রলোক আবার তাঁর চাকর পাঠিয়ে তাগাদা দিলেন।
ইতি,
আপনাদের ঘণশ্যাম।
বলাবাহুল্য, মেঘনাদবাবুর পক্ষে ছাতাটি ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ ওই ছাতা নিয়ে পরের দিন সকালে মেঘনাদবাবুর ছেলে বাজারে যায় এবং ফেরার পথে যখন বৃষ্টি থেমে গেছে, বাজারের পাশের চায়ের স্টলে এক কাপ চা খেতে গিয়ে সেখানে ফেলে আসে। পরে অবশ্য চায়ের দোকানদার ছাতার কথা অস্বীকার করেনি কিন্তু সেইদিনই দুপুরে আবার যখন বৃষ্টি আসে তখন দোকানদার মশায় সেটা মাথায় দিয়ে বাড়ী যান ভাত খেতে। বিকেলে সেই ছাতা নিয়ে দোকানদার মশায়ের ভাই খেলার মাঠে যান। ফেরার পথে ভাইটি তাঁর বান্ধবীর বাড়ি যান। সেখানে ছাতাটি রেখে আসেন কিন্তু এখন সেই বান্ধবীর বাড়িতে ছাতাটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেল কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।[রম্যরচনা, তারাপদ রায়]

মত্ত

একটা মামলার প্রয়োজনে একটা জেলা শহরে যেতে হয়েছিল। যথারীতি জেলা আদালতের উঠোনে এবং গেটের পাশে অনেকগুলি ভাতের হোটেল, পান-সিগারেট এবং মিষ্টির দোকান। এরই মধ্যে সবচেয়ে বড় মিষ্টির দোকানটায় গিয়ে দোকানের মালিককে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা এখানে সবচেয়ে বড় উকিল কে? আমি বাইরে থেকে এসেছি, একটু জানতে পারলে উপকার হয়।
আমার জিজ্ঞাসা শুনে প্রবীণ মিষ্টান্ন বিক্রেতা কি যেন একটু ভেবে তারপর বললেন, ‘সবচেয়ে ভাল উকিল?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। আমার একটা মামলার ব্যাপারে বিশেষ দরকার।’
সবচেয়ে ভাল উকিল হলেন বলাইবাবু, আমাদের এই জেলার মধ্যে, তারপর ভদ্রলোক কিঞ্চিত ইতস্তত করে বললেন, “অবশ্য তিনি যদি মাতাল অবস্থায় না থাকেন?”
আমি একটু চিন্তিত হলাম। মাতাল উকিল! উকিলের আগে মাতাল বিশেষণটা খুব ভাল ঠেকছে না। সুতরাং আবার জিজ্ঞাসা করলাম, দু নম্বর ভাল উকিল কে?
মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী বললেন, ‘দু নম্বর ভাল উকিল হলেন ওই বলাইবাবুই, তিনি যখন মত্ত অবস্থায় থাকেন।’
বলা বাহুলা ভদ্রলোকের এই ধাঁধা আমার পছন্দ হয়নি, আমি অন্য উকিলের খোঁজ করেছিলাম।
এই উকিলবাবু আদালতে মদ খেয়ে আসেন। জানি তাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি এত মদ খান কেন? তিনি বলবেন, আমি এত-শত মদ কিছু খাই না। আমি অল্প-অল্প খাই, বারবার খাই।’
সে যা হোক, আদালত নয়, বিদেশী এক শহরে দেখেছি পানশালার নাম ‘অফিস’ (The office)। প্রথমে এই চমকপ্রদ নামকরণের ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। পরে রহস্যটা বুঝেছিলাম, এই পানশালা থেকে যত দেরি করেই বাড়ি ফেরা যাক, মিথ্যে না বলে সত্যি কথাই বলা যাবে, ‘অফিসে দেরি হয়ে গেল।’
মদ ও মদ্যপের গল্পের শেষ নেই। আগে অনেক বলেছি, পরে অনেক বলব। আপাতত একটি অনুকাহিনী উপস্থাপন করছি। এক পানশালায় তিনজন বাঁধা খাদ্দের। বেয়ারারা তাদের নাম দিয়েছে, বড়দা, মেজদা, ছোড়দা। যথারীতি একদিন সন্ধ্যায় এই তিনজনে বসে পান করছিলেন। বড়দা একটু বেশি বেশি খাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ বাদে ডোজের মাত্রা বেশি হয়ে যাওয়ায় বড়দা বেহুঁশ হয়ে চেয়ার থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন।
মেজদা এবং ছোড়দার কিন্তু এতে ভ্ৰক্ষেপ নেই, বরং বড়দার এই বেহুশ হয়ে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা দুজনে খুব তারিফ করতে লাগলেন এই বলে যে, বড়দার একটা মাত্রাজ্ঞান আছে, ঠিক কখন থেমে যেতে হয় সেটা বড়দা জানেন।’
এইসময় এক আগন্তুক পানশালায় প্রবেশ করে ছোড়দা-মেজদার টেবিলের সামনে বসলেন। তাকে বেয়ারা এসে, “কি দেব? প্রশ্ন করার আগেই তিনি অধঃপতিত বড়দার দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইনি কে?
বেয়ারা বলল, ইনি বড়দা।’
আগন্তুক বড়দাকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে তারপর প্রায় ষড়যন্ত্রকারীর মতো গলা নামিয়ে বেয়ারাকে বললেন, “ওই বড়দাকে যা দিয়েছিলে, ভাই আমাকেও তাই দিয়ো।’

পুনশ্চ :
রাম, আমার পোষা চরিত্র, অবশেষে তার মাতলামির গল্পই বলি। রোববার সকালে অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে হ্যাং-ওভারগ্রস্ত গঙ্গারাম বেশ কয়েকবার আড়মোড়া ভাঙার পর বৌকে জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যাগো, কাল রাতে আমি বাড়ি ফেরার সময় কি কোন হইচই করেছি।’
‘না তুমি করেনি।’ গম্ভীর মুখে গঙ্গারামের বউ বলল, হইচই করার মতো অবস্থা তোমার ছিল না। তবে যারা তোমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তারপর চ্যাংদোলা করে, বাড়ির মধ্যে দিয়ে গেল তারা খুব হইচই করেছিল। পাড়ার সমস্ত লোক জেগে উঠেছিল।’

[মাতাল সমগ্র, তারাপদ রায়]

 

আত্মনেপদী

বিষন্নবদন স্থূলদেহ, স্ফীতোদর, সদাসর্বদা ঘর্মাক্ত অশক্ত কলেবর এক রোগী গেছেন এক বড় ডাক্তারের কাছে।
ডাক্তারবাবু রোগী চেনেন না, এই প্রথম দেখছেন তাকে। সুতরাং যা-যা করার সবই করলেন।
নাড়ি টিপলেন, জিব দেখলেন, বুকে স্টেথষ্কোপ যন্ত্র লাগিয়ে মনোযোগ দিয়ে অন্তর্নিহিত আওয়াজ শুনলেন।…
কিন্তু ডাক্তারবাবু খারাপ কিছুই পেলেন না।
অতঃপর চিন্তিত ডাক্তারবাবু রোগীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “…কী শরীর খারাপ লাগে আপনার?”
শুকনো মুখে, করুণ কণ্ঠে রোগী বললেন, “কী বলব ডাক্তারবাবু। মনে কোনও আনন্দ পাই না। সুখ নেই। সবসময় কেমন মন খারাপ, বিষণ্ণতা। কিছু ভাল লাগে না। মাথা সবসময় টিন টিন করে। শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে। কোনও কাজে আনন্দ পাই না।”

…রোগীর স্বাস্থ্য যেমন মারাত্মক, গলার স্বরও তেমন মারাত্মক। সেই মারাত্মক গলায় যথাসম্ভব খ্যান খ্যান করতে করতে রোগী তখনও বলে চলেছেন, “… কতকাল ভাল করে হাসিনি।”
…ডাক্তারবাবু রোগীকে বললেন, “একটা ভাল পরামর্শ দিচ্ছি। …আচ্ছা আপনি তারাপদ রায়ের নাম জানেন?”
রোগী বিষন্ন চোখে তাঁর গোলমেলে কণ্ঠকে যতটা অস্ফুট করা যায় তাই করে সংক্ষপ্ত উত্তর দিলেন, “তা জানি।”
“আপনি তারাপদ রায়ের লেখা পড়ুন, তারাপুবাবুর লেখা কান্ডজ্ঞান, জ্ঞানগম্যি এইসব পড়ুন।… তারাপদ রায়ের রচনা পড়ে আপনার মনে আনন্দ, মুখে হাসি, জীবনে ফুর্তি সব ফিরে আসবে।”
ম্লানতম কন্ঠে, বিষন্নতম মুখে স্থূলদেহ ঘর্মাক্ত কলেবর রোগী বললেন, “ডাক্তারবাবু। আমিই তারাপদ রায়।”

[রম্যরচনা, তারাপদ রায়]

সময়টা এমন যাচ্ছে যেনো বই পড়া থেকে দিন দিন আমরা সরে দাঁড়াচ্ছি। ব্লগ, ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে জড়িয়ে পড়ছি। জড়িয়ে পড়ুন কিংবা জড়িয়ে ধরুন, তারাপদ রায় পেছনে আছে। বই পড়া থেকে বের হলে শান্তি নেই, তারাপদ রায়ের গল্পগুলো পড়তে কেমন লাগে জানাবেন এখানে। বই থেকে সংকলন ও সম্পাদনা করে যেসব মাধ্যমে মানুষকে পড়ানো যায় সেভাবে পড়ান। ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না। ভালো থাকবেন, সবসময় হাসবেন।😃

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

পৃথিবীর পথে গন্তব্যহীন পরিব্রাজক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।