পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা

()

বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ পাবর্ত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লিখেছেন এবং সে বই পড়ে আমাদের তথাকথিত পাবর্ত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ধারণা বদলে যায় অনেকাংশে। ১৯৯৭ সালে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে তিনি পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন এবং ঘুরে এসে লিখেন পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা বইটি। বইটি পড়ে যেমন পাওয়া যায় পাবর্ত্য চট্টগ্রামের অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণণা তেমনি পাওয়া যায় শান্তি চুক্তিসহ পাহাড়ের নানান সমস্যার কথা। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলায় ঘুরার  সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সে সুবাধে পাহাড়ী জনগোষ্টির বিশাল একটি অংশের সাথে সময় কাটিয়েছি।

 

সোনাইছড়ি ও নাইক্ষংছড়ির সংযোগ সড়ক

পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বিশাল একটা অংশ অল্প খরচে আপনার ঘুরা হয়ে যাবে যদি আপনি সঠিক ভ্রমণ নির্দেশিকা পেয়ে যান। কক্সবাজার এবং বান্দরবান পাশাপাশি লাগানো বললেই চলে। সুতরাং একসাথে সাগর-পাহাড় দেখা খুব মুশকিলের বিষয় নয়। কক্সবাজার থেকে রামু মাত্র ২০ বিশ কিলোমিটারের কম রাস্তা আর রামু থেকে বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি মাত্র ৯ নয় কিলোমিটার। নাইক্ষংছড়ি পৌঁছে গেলে  খুলে যাবে আরো অনেক জায়গা আবিষ্কারের পথ।

 

সোনাইছড়ি থেকে মায়ানমারের সীমান্ত ঘুমধুম সংযোগ সড়ক

 

সোনাইছড়ি মূলত রামু থেকে ৬ ছয় কিলোমিটারের মেঠো পথ, যেখান থেকে সংযুক্ত বান্দরবান সদর, মায়ানমার সীমান্ত এবং রামু। এই রাস্তা দিয়েই আপনি যেতে পারেন মায়ানমার সীমান্তে অথবা নো ম্যান্স ল্যান্ডে। এক নং ছবির সড়ক এবং দ্বিতীয় ছবির সড়ক এক নয়। সোনাইছড়ি থেকে ঘুমধুম যাওয়ার পথেও বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন আপনি। আদিবাসী ছাড়াও বর্তমানে সেটেলার বাঙালীর সংখ্যা পহাড়ে বেশী এবং দিন দিন দখল-দারিত্বের রাজনীতি পাহাড়ীদের একদিন সমূলে বিনাশ করতে পারে।

 

একেকটি পাহাড়ের চূড়ায় একটি করে ঘর আদিবাসী ও বাঙালী সেটেলারদের

হুমায়ুন আজাদ তার বইটিতে যদিও আদিবাসীদের নানান দাবীকে বাস্তবায়িত করা অসম্ভব বলে দাবী করেছেন এবং এনিয়ে আছে নানান গুন্জনও। অনেক আদিবাসী নেতা তাদের বিভিন্ন বয়ানে বইটির সমালোচনা দিতে গিয়ে বলেছেন, হুমায়ন আজাদ পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে কখনোই পুরোপুরি জানতে পারেন নি কেনোনা তিনি সরকারি সফরে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে ঘুরেছেন এবং পাহাড়ের সমস্যার যা গল্প তিনি সরেজমিনে তেমন একটা দেখেন নি, বরং যা লিখেছেন সেনাবাহিনীর মুখে শোনা বক্তব্য।

 

সমতল থেকে এসব রাস্তা সুউচ্চ পাহাড়ের গায়ে

সোনাইছড়ি থেকে নাইক্ষংছড়ি যাওয়ার পথে অসংখ্য সুউচ্চ পাহাড় আপনকে পাড়ি দিতে হবে এবং পাহাড়ের গা কেটে এখানে করা হয়েছে রাস্তা। এসব রাস্তাগুলোতে সচরাচর মোটরসাইকেল, জিপ চলতে দেখা যায়। ভালো মানের গাড়ী না হলে এসব পাহাড় বেয়ে উপরে উঠা অসম্ভব প্রায়। সবুজের সমারোহ চারিদিক।

 

মেঘ আর মায়ানমারের পাহাড়ের চুম্বন

দূরের সুউচ্চ পাহাড়টি মায়ানমারের, স্থানীয়ভাবে এসব পাহাড়কে কালোপাহাড় বলেই আখ্যায়িত করা হয়। পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়েই এই ছবিটি তোলা। পাহাড়ের উপর থেকে মেঘ খুব কাছে মনে হয়। কালোপাহাড়গুলোর নামকরণের পেছনের ইতিহাস হলো নাইক্ষংছড়ির এসব পাহাড় থেকে তাকালেই ওগুলোকে দূ দূ কালো দেখায় এবং অনেক উচ্চ দেখায়। বাংলাদেশের পাহাড়ের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হবে কালোপহাড় বাড়ি আর মেঘ হলো তা উড়ন্ত ছাদ।

 

পাহাড়ের উল্টোপাশে তাকালে

পাহাড়ের উল্টোপাশে তাকালে দেখতে পাবেন সু-গভীর খাদ আর তার মধ্যেই রোপন করা হয়েছে অসংখ্য কলাগাছ। এভাবেই হয়তো একদিন পাহাড়ের স্বকীয়তা এবং স্বভাব নষ্ট হয়ে যাবে। পাহাড়কে ধ্বংস করার যেনো লীলাযজ্ঞ এখানে। সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এসব চোখে পড়লে মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। ধ্বংসের এসব নষ্ট মানুষদের সাথে থাকাটা একধরণের মানসিক পীড়াদায়ক বৈকি।

 

রামুর একটি পাহাড়ে অবহেলায় পড়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো বৌদ্ধ নিদর্শন

কক্সবাজারের রামুতে ছোট ছোট কিছু পাহাড় রয়েছে যা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থিত। রামুর রাজারকুল ইউনিয়নের একটি পাহাড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্চে একটি বৌদ্ধ নিদর্শন যা প্রায় হাজার বছরের পুরোনো। অনেকবার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আনলেও কোন প্রকার সুরাহা হয়নি।

 

বৌদ্ধ মন্দির

পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ জায়গায় ঘুরলে আপনি দেখতে পাবেন প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শন। একসময় পুরো চট্টগ্রাম ছিলো আরাকান বা রাখাইনদের রাজ্য। পরবর্তীতে তারা এখান থেকে বিতাড়িত হন এবং এখনো বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে তাদের করা নানান স্থাপনা।

অশ্বত্থ বৃক্ষ বা বোধি বৃক্ষ

নাইক্ষংছড়িতে অবস্থিত এই বোধিবৃক্ষটি এবং স্থানীয়ভাবে এটিকে সত্যবোধি বলে জানে। মূলত মহামতী গৌতম বুদ্ধ অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে বসেই ধ্যান করেছিলেন এবং বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে এই বৃক্ষ সত্য এবং যা কিছু এখানে মানস করা হয় তা পাওয়া যায়। তাছাড়া স্থানীয় এক ছেলে এই বৃক্ষকে অবজ্ঞা করার কারণে বর্তমানে পাগল হয়ে আছে বলেও এখানে প্রচলিত।

সন্ধ্যার পাহাড়

সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ের চিত্র অনেকটা বদলে যায়। এখানে পাখিদের কাকলী, বর্ষার বিজলী অনন্য এক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এভাবে রামু থেকে বান্দরবান এবং মায়ানমারের সীমান্ত আপনি এক নিমিষেই ঘুরে আসতে পারেন এবং যারা সত্যিকারের ভ্রমণ পিপাসু তাদের কাছে এসব জায়গাগুলো স্বর্গরাজ্য মনে হবে।

পাহাড়ীয় বাংলা মদ তৈরি

প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয় বাংলা মদ এবং সঠিক পরিমাণে পান করাকে আদিবাসীরা ঔষধ হিসেবে নেনে। আপনার পাহাড় ঘুরা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে নিশ্চয় যদি না এক গ্লাস পিওর বাংলা মদ না গিলেন। আর ঠিক এভাবেই সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হবে হিংসার ঝরনাধারা।

সকল ছবি আমার ব্যক্তিগত ভ্রমণে তোলা, সকল ছবির কপিরাইট মানার অনুরোধ রইলো।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

পৃথিবীর পথে গন্তব্যহীন পরিব্রাজক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।