পার্বত্য চট্টগ্রামে কার উন্নয়ন, কীসের উন্নয়ন?

()

পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের উন্নয়নের বুলি শুনতে শুনতে যেন কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। যেন উন্নয়ন হলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন হচ্ছে বলেও সরকারের দিক থেকে হার হামেশাই বলা হচ্ছে। কিন্তু আদতে কি তাই?

আসুন একটু তলিয়ে দেখা যাক-
১। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুদত্ত চাকমা বলেছেন- “পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় দারিদ্র্যের হার এখনো ৪৮ শতাংশের ওপর রয়ে গেছে”। গত ৫ জুলাই বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ও ইউএনডিপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্যটি জানান।

২। অপরদিকে, কাপেং ফাউন্ডেশন নামে অপর একটি বেসরকারি সংগঠনের জরিপ অনুযায়ী পার্বত্য অঞ্চলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ৬৫ শতাংশ এখনো দারিদ্র্য সীমার মধ্যে রয়েছে।

৩। গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও ওয়াল্ড ভিশনের যৌথ উদ্যোগে ‌‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবস্থান: নতুন নীতি কাঠামোর প্রস্তাবনা’ শীর্ষক বার্ষিক সম্মেলনে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেছেন ‘ দেশের সাধারণ দরিদ্র হার ২১ শতাংশ হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দারিদ্র হার ৬০ শতাংশ।

এসব চিত্রের মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নামে যা হচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষের জীবন মানের তেমন কোন পরিবর্তনই হচ্ছে না। যদি সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন হতো তাহলে এমন চিত্র নিশ্চয় উঠে আসতো না।

তাহলে উন্নয়নের সুবিধাভোগী কারা?
সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নামে যে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে সেগুলোর আংশিক অংশই মাত্র সাধারণ জনগণের জীবন-মান উন্নয়নের কাজে ব্যয় হয়ে থাকে।  তার অধিকাংশই চলে যায় দুর্নীতি-অনিয়মকারীদের পকেটে। ফলে দেখা যায়, যারা সরকারি দলের সাথে যুক্ত থাকেন তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়ে উঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে জেলা পরিষদ নামের দুর্নীতি আখড়ায় যারা জড়িত রয়েছেন তারা।  যখনই সরকারের আনুকূল্য পেয়ে সরকারি দলের কোন ব্যক্তি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য হয়ে যান তখনই তার যেন ভাগ্য খুলে যায়। রাতারাতি কোটিপটি বনে যান এইসব লোকজন। সাধারণ জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যত পারেন তারা নানা কৌশলে হাতিয়ে নেন, নিজেদের পকেটস্থ করেন। বদলে ফেলেন তাদের জীবনযাত্রার মান। শুধু তাই নয়, এই পরিষদগুলোতে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যও যেন ওপেন সিক্রেট। এই হলো সরকারের উন্নয়ন সুবিধাভোগীদের একটা অংশ।

অপরদিকে বেসরকারি নানা সংস্থাসমূহ কর্তৃক যেসব উন্নয়নমূলক কাজ করা হয় তাতেও রয়েছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি। সাধারণ মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের কথা বলে কোটি কোটি টাকার যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তার সিকি অংশ মাত্র সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জুটে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশ বরাদ্দই নানা খাতে মোটা খরচ দেখিয়ে পকেটস্থ করা হয়ে থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন মানের তেমন কোন পরিবর্তনই হয় না।

পর্যটন-উন্নয়নের নামে চলছে পাহাড়িদের উচ্ছেদ
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের প্রধান টার্গেট হচ্ছে পর্যটন। সরকার চাচ্ছে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামকেই পর্যটন কেন্দ্র বানিয়ে ফেলতে। আর এসব পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলোকে উচ্ছেদের মাধ্যমে। বান্দরবান, সাজেকসহ যেসব এলাকায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে বা আরো যেখানে যেখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে সেখানে পাহাড়িরা নিজ জায়গা-জমি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন। এ যাবত কত সংখ্যক পাহাড়ি উচ্ছেদ হয়েছেন তার পরিসংখ্যান হয়ত এ লেখায় দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সরকার উন্নয়নের নামেই জোরপূর্বক এই উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন পাহাড়ি জনগণের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এর থেকে পাহাড়িরা মুক্তি পেতে চায়। তারা উন্নয়নের নামে আর উচ্ছেদ হতে চায় না, তারা নিজ নিজ বসতভিটা, জায়গা-জমিতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চায়।

ভূমি দস্যুদের রাজত্ব
উন্নয়নের আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন চলছে ভূমি দস্যুদের রাজত্ব। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি (মন্ত্রী, এমপিসহ), সামরিক-বেসামরিক আমলা, জি কে শামীমদের মত ভূমি দস্যুরা হাজার হাজার একর জমি লিজ নেয়ার নামে বেদখল করেছে। এসব জমিতে তারা রিসোর্ট তৈরির নাামে, পর্যটনের নামে কিংবা বাগান সৃজনের নামে পাহাড়ি জনগণকে উচ্ছেদ করছে। আর এসব ভূমি দস্যুদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের রয়েছে সখ্যতা। ফলে পাহাড়িরা জমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়। এমনকি পাহাড়িরা ভুমিদস্যুদের সন্ত্রাসীদের দ্বারা হামলারও শিকার হয়। এতে করে পাহাড়িরা নিজ বসতভিটা, জায়গা-জমি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এভাবে ইতোমধ্যে শত শত পাহাড়ি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। পাহাড়িরা দিন দিন নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে।

উন্নয়নে কি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমধান হবে?
পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগণ চায় নিজেদের অধিকার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে। কিন্তু সরকার তা না দিয়ে কথিত উন্নয়নের নামে এ অঞ্চলকে করায়ত্ব করতে চাচ্ছে। ফলে সমস্যা সমাধান না হয়ে আরো জটিল হয়ে উঠছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

পাহাড়িরা যে উন্নয়নের বিরোধী তা কিন্তু নয়। তারাও উন্নয়ন চায়। কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার যে উন্নয়ন–এমন ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন পাহাড়িরা চায় না।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার অতীতের জিয়াউর রহমানের শাসনকালের মতো উন্নয়নের নামে এ অঞ্চলকে শাসন শোষণ করার পথ বেছে নিয়েছে। জিয়াউর রহমান এ অঞ্চলের সমস্যাকে অর্থনৈতিক সমস্যা বিবেচনা করে নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি চার লক্ষাধিক সেটলারকে এ অঞ্চলে পুনর্বাসন করে সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছিলেন। একইভাবে দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারও মূল সমস্যাকে আড়াল করে উন্নয়নের নামে পাহাড়ি উচ্ছেদ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের এ পদক্ষেপ সমস্যা সমাধানের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এ অঞ্চলের যে সমস্যা তা কোনভাবেই উন্নয়নের সমস্যা নয়। এ অঞ্চলের সমস্যা হচ্ছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সমস্যা। তাই কথিত উন্নয়নে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে না।

পাহাড়ি জনগণ যেদিন নিপীড়ন-নির্যাতন ও শোষণ-বঞ্ছনা থেকে মুক্তি পাবে, যেদিন নিজেদের স্বশাসনের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে সেদিনই এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সমাধানের পথ সূচিত হবে।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার তালুক চাকমা

২ টি মন্তব্য

  1. তপন চাকমা

    লেখাটি অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত।

  2. আমরা এসব চোখে দেখি না। আমাদের চোখে ফোসকা পড়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।