প্রকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ক পূর্বশর্তসমূহ

()

১৯শ শতাব্দীর শুরুর দিকে পৃথিবীতে বিজ্ঞান এমন একটা পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিলো যা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আত্মপ্রকাশে সহায়ক হয়েছিলো । বলবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, জীববিদ্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিকাশ পৃথিবীর বস্তুগত ঐক্যকে দেখিয়েছিলো । আরো দেখিয়েছিলো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোর দ্বান্দ্বিক চরিত্রকে । ঐ সময়ের তিনটা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ প্রতিষ্ঠায় বিরাট অবদান রেখেছিলো । (১) শক্তির অক্ষয়তা ও রূপান্তরের নিয়ম : ১৮৪২-১৮৪৫ সালে, জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী জুলিয়াস রবার্ট মায়ার শক্তির অক্ষয়তা ও রূপান্তরের নিয়ম আবিষ্কার করেন । মায়ার থেকে আলাদাভাবে বৃটিশ পদার্থবিজ্ঞানী উইলিয়াম আর গ্রোভ ও জেমস পি. জুল, ওলন্দাজ ইঞ্জিনিয়ার লুডউইগ আ. কোলডিং এবং রাশিয়ান বিজ্ঞানী হেইনরিখ লেন্ৎসও সেই নিয়মটি আবিষ্কার করেছিলেন ।

এই নিয়টি আবিষ্কার হওয়ায় দেখা গেলো যে যান্ত্রিক বল, তাপ, আলোক, বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলো বস্তুর গতির নানা ধরনের রূপ । এই রূপগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয় । একটি অপরটির সাথে যুক্ত । প্রমাণিত হয় নির্দিষ্ট অবস্থায় সেগুলো ক্ষয় না হয়ে একটি অপরটিতে রূপান্তরিত হয় । এই আবিষ্কার প্রমাণ করলো যে শক্তির কোনো উদ্ভব নেই । বিলোপ নেই । আছে শুধু একটি রূপ থেকে আরেকটি রূপে অবিরত রূপান্তর । এঙ্গেলস এই নিয়মটিকে অভিহিত করেছিলেন প্রাকৃতিক অনাপেক্ষিক বা শর্তমুক্ত (absoluate) নিয়ম বলে ।এই নিয়মটিই হলো পৃথিবী সম্বন্ধে দ্বান্দ্বিক মতের প্রাকৃতিক বিজ্ঞানগত ভিত্তি । (২) উদ্ভিদ ও প্রাণীর কোষীয় তত্ত্ব : ১৮৩০-এর দশকে রাশিয়ান বিজ্ঞনী পাভেল গরিয়ানিনভ, চেক জীববিজ্ঞানী জান পুরকিনে ও জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী মাথিয়াস জেকব শ্লেইডেন ও থিউডর শোয়ান উদ্ভিদ ও প্রাণীর গঠনকাঠামোর কোষীয় তত্ত্ব আবিষ্কার করেন । এই তত্ত্ব উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের মধ্যে ঐক্য দেখতে পায় এবং উদ্ভিদ-প্রাণীর জীবনসত্তার একইরূপ গঠনকাঠামো আবিষ্কার করে ।

সেগুলোর বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে । উদ্ভিদ ও প্রাণীর কোষীয় তত্ত্ব আবিষ্কার পুরনো অধিবিদ্যাগত ধারণাকে বাতিল করে এবং প্রাকৃতিক দ্বান্দ্বিকতা প্রমাণ করে । (৩) ডারউইনের বিবর্তনবাদ : বৃটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব প্রাকৃতিক দ্বান্দ্বিকতা উপলব্ধিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলো । প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম অবস্থায় উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন থেকে অসংখ্য তথ্যের ভিত্তিতে ডারউইন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে প্রজাতিগুলো অপরিবর্তনীয় নয় । সেগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে । তিনি সূত্রবদ্ধভাবে দেখান যে সকল বিদ্ধমান প্রজাতি প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভুত হয়েছে । তা হয়েছে অন্যান্য পূর্ববর্তী প্রজাতি থেকে । ডারউইনের মতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজাতিগুলো পরিবর্তিত হয়েছিলো প্রাকৃতিক ও কৃত্রিমভাবে । ‘প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতিগুলো বিচ্ছিন্ন, আকস্মিক, ঈশ্বরসৃষ্ট এবং অপরিবর্তনীয়’ ডারউইন এই অভিমতের অবসান ঘটান ।

ডারউনের বিবর্তনবাদের মাধ্যমে সর্বপ্রথম পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করান জীববিদ্যাকে । আমরা এখন বলতে পারি শক্তির অক্ষয়তা ও রূপান্তরের নিয়মটি বস্তুবাদের প্রধান সূত্রটি প্রমাণ করেছিলো যে বস্তু ও গতি চিরন্তন, অসৃজনীয় এবং অবিনাশী । বস্তুর গতির রূপগুলোর ঐক্য ও বৈচিত্র্য এবং সেগুলোর পরিবর্তনের নিয়মগুলো দেখিয়েছিলো এই তত্ত্ব । কোষীয় তত্ত্ব উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে সকল বিভাজন ভেঙ্গে বিকাশের সাধারণ নিয়ম-শাসিত জৈব পৃথিবীর ঐক্য প্রমাণ করেছিলো । বিবর্তনবাদ দেখিয়েছিলো যে বর্তমানের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সকল প্রজাতিই দীর্ঘকালীন বিবর্তনের ফল । ডারউইন দেখিয়েছিলেন যে নিম্নতর সরল জীবসত্তা বিবর্তিত হয়ে জটিল জীবসত্তায় রূপান্তরিত হয়েছে । আর মানুষ প্রাণীজগতের এক দীর্ঘকালীন বিবর্তনের ফল । বিবর্তনবাদ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূল ধারণা , পরিবর্তন হয় সরল থেকে জটিলে, নিম্নতর থেকে উচ্চতরে – এটি প্রমাণ করেছিলো । সুতরাং বিজ্ঞানের এই তিনটি আবিষ্কার মার্কস-এঙ্গেলসের দার্শনিক তত্ত্ব দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ গড়ে ওঠার পেছনে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলো ।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার লুৎফর রহমান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।