প্রাপ্তি স্বীকার

()

দাদু।
ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর ভরসা যে মানুষটাকে করা যায় ; তিনি দাদু। রগড়, অথচ গল্প ; উদ্দীপনায় সাহসিকতার শিক্ষা। শুভ্র, – যেখানে পবিত্রতা। অন্ধকার যেখানে কুসংস্কার! গল্প-ছন্দ যেখানে মাথা না নোয়াবার দীক্ষা। এটা কে শিক্ষিয়েছে? তুমি ছাড়া। তোমার সাথে আমার স্মৃতি খুব বেশি মনে নেই। খুউব ছেলেবেলায় তুমি আমায় ছেড়ে গেছো । অনেকদিনের সেই তোমার মুখটাও ভুলে গেছি প্রায়। আমি যখন সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করি তখনি তুমি এই মর্ত্যের মায়া ত্যাগ করেছো। তবে তোমার শেখানো আমার প্রথম বানান করা ” প এ আকার থ, র – পাথর” যা কিনা আমার স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল! তোমাকে ভালোবাসি কখনো বলা হয়নি। তুমি বুঝি আমায় খুব ভালোবাসতে?
আমি যখন আমার গ্রামে স্কুলের পড়া চুকিয়ে শহরে পাড়ি জমায় আমার উচ্চতর জ্ঞানের(ডিগ্রী) জন্য, তখন তোমার ছেলে আমায় একটা ডায়েরি দিয়ে বলেন – এটা তোমার দাদুর স্মৃতি। তখনো সেভাবে কিছু বুঝিনি, মরা মানুষের আবার স্মৃতি! কি বোকা ছিলাম তখন।
আরো অনেকদিন পর, আমি এখন সভ্য মানুষ। যদিও পুরোপুরি সুসভ্যতার সন্ধান পায়নি। আমি এখন হাসপাতালে ইন্টার্ন করছি। সেদিন শিশু ওয়ার্ডে রাতে ডিউটি করছিলাম। এত এত বাচ্চা কষ্টে কাঁতরাচ্ছে যেন একেকটি দুঃখঘন্টার স্মৃতিচিহ্ন। এরমধ্যে একটি দৃশ্য আমার মনে যেন দাগ কেটে থাকলো। সেদিনি এ্যাডমিট হয়েছিলো বাচ্চাটা। সরকারি হাসপাতাল তো বুঝতেই পারছেন রোগীর চাপ প্রচুর। ফেব্রুয়ারি মাস বেশ শীত ছিলো, তারুপোর ফ্লোরে জায়গা হলো। বাচ্চার সাথে একজন পৌঢ় ব্যক্তি ছিলেন যিনি কিনা সারারাত বাচ্চাটাকে কোলে করে রেখছিলেন। পরে জানলাম উনি নাকি বাচ্চাটার দাদা।
এরপর থেকে দাদুর স্মৃতি মনের মধ্যে মাথাচাড়া দেবার উৎপাত! তবুও যেন দাদুর মুখ আবছা আমার মমস্তিষ্কে। এমনিতে আমাদের ছুটি হয় না তারুপোর স্মৃতির দহন।

আজ তোমার ডায়েরিটা পড়ে শেষ করলাম আর তখনকার সেই ছোট্ট আমাকে দেখছিলাম। তুমি লিখেছ –
১২/০৭/৯৯। মাহিন কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে আজ সে ০১থেকে ১০০ গুনেছে, আমার যেন বিশ্বাসী হচ্ছে না!
০৯/০১/২০০০। আজ এক এলাহী কান্ড ঘটে গেল মাহিনকে নিয়ে। অবশ্য আমিই জয়ি হয়েছি। আজ ওর স্কুলের প্রথমদিন, উফ!!
০৩/০৪/০০। আজ মাহিন এক অবিশ্বাস্য কর্ম করেছে। কিভাবে যেন ওর বাবার কানে পিপড়া চলে যায়। কষ্টে কেমন ছটফট করছিলো কারোর মাথায় আসছিলো না কি করা যায়? আর মাহিন কিনা বোতলের নারিকেল তেল ওর বাবার কানে ঢেলে দিলো! আশ্চর্য ওর বাবার তরপানি বন্ধ। কি বুদ্ধি হয়েছে বাবা! ও নিশ্চয় ডাঃ হবে।
০৫/০৭/২০০০। ছেলেটা দিন দিন কেমন পাকনা হয়ে যাচ্ছে। আজ দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে এক কান্ড করে বসলো। পুকুর পাড়ে ওর চাচ্চু কাজ করছিলো মাহিন চাচ্চুর সাথে কথা বলে একটুপর পুকুরে ইট ফেলে হঠাৎ উধাও। সবার কি দুশ্চিন্তা! পুকুরে খেপলা জাল পর্যন্ত টানা হয়। কান্নাকাটিতে একেবারে বিদিকিচ্ছিরি অবস্থা! পরে হটাত মাহিন ওর মাকে ডেকে বলে ‘মা তোমার কি হয়েছে কাঁদছ কেন? এদিন ভুলবার নয়। সে এক কিম্ভূতকিমাকার অবস্থা! সে নাকি ঘরে খাটের কোনায় ছিলো। কি দুষ্ট কি দুষ্ট “!
আরো কত গল্প। জানি ভালোবাসার কোন প্রাপ্তি স্বীকার হয় না।তবুও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার দেখা যেকোন অসহায় দাদুকে সাধ্যমতো সাহায্য করবো। তোমার বিশতম প্রয়ান দিবসের এই হোক আমার প্রাপ্তি স্বীকার ; প্রবীণ বান্ধব বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার মুহাম্মদ নাজমুল হক

পেশাঃ ফিজিওথেরাপীস্ট নেশাঃ লেখালেখি করা শখঃ বই পড়া , ভ্রমন আর অদুর ভবিষ্যতে ফিল্ম মেকিং এর ইচ্ছা আছে ;

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।