আমাদের স্কুল আনন্দের এক রঙিন ফুল

ছুটির ঘন্টা

()

অষ্টমের পাঠ চুকিয়ে আমরা সবেমাত্র নবমে ভর্তি হয়েছি। নবম শ্রেণিতে উঠতেই ফাস্ট ব্যাঞ্চার মেধাবী বন্ধুরা চলে  গেল বিজ্ঞান শাখায়। আমদের মতো টেনেটুনে পাশ করাদের স্থান হলো বানিজ্যিক শাখায়। স্কুলের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো এক নোটিশ আমাদের বিভাগ ঠিক হয়েছিল।

আমাদের বার স্কুলের সব কড়া শিক্ষকের ক্লাস পড়ল বানিজ্যিক শাখায়। হেডস্যার বলে দিয়েছেন এইবারের বানিজ্যিক শাখার ব্যাচটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাছাড়া আজকাল বাবা-মা’রা সন্তানদের খোঁজ রাখেন না। ছেলেদের  গোঁফ গজানোর আগে মোবাইল কিনে দিচ্ছেন।

আমাদের হেডস্যারের নাম আলমগীর হোসেন। সবাই আলমগীর স্যার নামে চিনে। চুলবিহীন মাথা আর অগ্নিমূর্তি চোহারা। পারস্য উপসাগরের দুর্ঘটনা কবলিত তেলক্ষেত্রের আগুন নিবে গেলেও স্যারের চোখের আগুন কখনো নিভতে দেখিনি। তবে পড়–য়াদের সাথে স্যারের বেশ খাতির ছিল। এই ধরনের একজন লোকের সাথে কেউ খাতির জমাতে পারে তা আমার কল্পনায় আসে না।

পিটি ক্লাসে অনুপস্থিতদের তালিকা চলে যেত শ্রেণি শিক্ষকদের হাতে। ফলে আমরা যারা পিটির সময়ে লিচু গাছের মগডালে ঝুলতাম প্রথম ক্লাসেই তাদের পিঠের শার্ট তুলে বেঞ্চের নিচে মাথা রাখতে হতো। শিক্ষকদেরও নানা নিয়মের মারপ্যাচে ব্যতিব্যস্ত রাখতেন হেডস্যার। ফলে সামনাসামনি স্যারের প্রশংসা করলে মনে মনে কত গালি আর শাপ যে স্যারের প্রতি সবাই রাখে সেটা উপরওয়ালা জানতেন।

হেডস্যারের একজন প্রিয় ও আস্থাভাজন স্যার আছেন। তার নাম রবিউল ইসলাম। ইংরেজির রবিউল স্যার। আমরা কাগজে কলমে রবিউল স্যার লিখলেও বাবা মায়ের রাখা নাম বাদ দিয়ে আমরা কত ছদ্ম নাম দিয়েছিলাম তার ইয়াত্তা নেই।

হেডস্যার ও রবিউল স্যার প্রতিবছর স্কুলের মেট্রিকের রেজাল্ট উত্তরত্তোর ভাল করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতেন। হেডস্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের স্কুল প্রতিবছর মেট্রিকের রেজাল্টে উপজেলায় প্রথম হয়ে আসছে। কিন্তু গতবছর আশানুরূপ রেজাল্ট হয়নি। তাই এইবছর মেট্রিক পরীক্ষার সময় হেডস্যার আর রবিউল স্যার দুইজনেই সন্ধ্যার পর সাইকেল নিয়ে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে পরীক্ষার্থীদের খোঁজখরব নিতে লাগলেন। পরিক্ষার্থীরা সন্ধ্যার পর পড়তে বসেছে কিনা খোঁজ নিতে লাগলেন। আমাদের অজপাড়া গাঁয়ে কুপির আলো যখন নিভো নিভো তখনও দুই শিক্ষক শিক্ষার মশাল নিয়ে ঘুরতেন এই পাড়া থেকে ঐ পাড়া।

একদিন সন্ধ্যার পর আমাদের সিনিয়র এক পরীক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে স্যারেরা ছাত্রকে পায়নি। বাবা- মাও জানেন না ছেলে কোথায় গেছে। এই অবস্থা দেখে হেডস্যার বেজায় ক্ষেপে যান।

‘সন্ধ্যার পর  খোয়ারে মুরগী ঢুকছে কিনা খবর নিতে পারেন কিন্তু মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছেলেটা পড়তে বসেছে কিনা খবর  নেননা। আর ফেল করলেই স্কুলের  দোষ!’

এই দুইজন মানুষের মাথায় শুধু স্কুল আর স্কুলই ঘুরত।

স্কুলের মিটিংয়ে আমাদের নবম শ্রেণির বানিজ্যিক শাখার শ্রেণি শিক্ষক করা হয়েছে রবিউল স্যারকে। হেডস্যারের দৃষ্টিতে এই কঠিন ব্যাচটাকে শায়েস্তা করতে পারবে একমাত্র রবিউল স্যার। ফলে আমাদের ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদেও ভালমন্দ,উপবৃত্তি, পাশ-ফেল, ছুটি, সুপারিশ এখন  থেকে সবকিছুর দায়িত্ব রবিউল স্যারের।

রবিউল স্যার আমাদেরকে প্রথম ক্লাসে ইংরেজি প্রথম পত্র ও প ম ক্লাসে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন। ফলে যারা প্রথম ক্লাসে পড়া শিখে আসত না তাদেরকে টিফিন ছুটিতে সেই পড়া মুখস্থ করতে হতো। রবিউল স্যার প ম ক্লাসে এসে প্রথম ক্লাসের পড়া কড়ায়-গন্ডায় উসুল করতেন। স্কুলে হেডস্যারের পরে ছাত্র-ছাত্রীরা রবিউল স্যারকেই ভয় পায়। কেউ যদি তার নজরে পড়ে তার রক্ষা নেই। আমরা বলতাম টার্গেটে পড়া। রবিউল স্যারের টার্গেটে পড়লে তার আর পান থেকে চুন খসানোরও সুযোগ নাই।

নবমে উঠে সদ্য কৈশোর জেগে উঠা ছাত্ররা সবে চুলের নতুন কাট দেওয়া শুরু করেছে। স্কুলের নিয়ম ভেঙে রঙিন পোশাক পড়তে শুরু করেছে। ফলে যারা ক্লাসে স্কুল ড্রেস না পরে আসবে তাদের পুরা ক্লাস কান ধরে বেে র উপর দাঁড়িয়ে থাকার নিয়ম চালু করলেন রবিউল স্যার। নবমে উঠে সদ্য বড় হয়ে উঠার উদ্দীপনায় চুলে নতুন কাট দেওয়া  ছেলেরা এতসব কড়াকড়িতে টুপি পড়া শুরু করে।

এতসব কড়া নিয়মের পরও আমাদের ক্লাসে একটা গ্রুপ রঙিন  পোশাকে ক্লাসে আসত। নবমে উঠার পরও স্কুলের কয়েকটি নিয়ম ভঙ্গ করা যাবে না তা তো হয় না। তবে তাদের সবার ব্যাগে থাকত একটি স্কুল ড্রেস। ক্লাসের পেছনে গিয়ে রবিউল স্যারের ক্লাসের আগে রঙিন পোশাক পাল্টিয়ে স্কুল ড্রেসের সাদা শার্টটা পরে নিত।

রবিউল স্যারের এত পড়ার চাপ আর নিয়মের কড়াকড়ি আমরা আর নিতে পারছিলাম না। ফলে আমাদের অনেকেই চতুর্থ ঘন্টার পর টিফিন ছুটিতে স্কুল পালাত। অর্ধদিবসের ছুটির জন্য নানা জনের নানা ফন্দি ফিকির ছিল। কিন্তু কোন ফন্দি ফিকিরেই রবিউল স্যারের মন গলানো যেত না। ফলে ছাত্ররা স্কুল পালানোর নতুন নতুন বুদ্ধি বের করল।

নতুন ভবনের পেছনে সীমানা দেওয়ালের নিচে শেয়াল গর্ত করে আসা যাওয়ার পথ করেছে। উত্তর-পূর্ব পাশের বাথরুমে ছাদেও এসে পড়েছে মেহগনি গাছের মগডাল। এই গাছের গোড়া সীমানা দেওয়ালের ওপারে। ফলে বাথরুমের ছাদে উঠতে পারলেই দেওয়া টপকানো যেত।

এই দুইপথে যারা পালাতে ব্যর্থ হতো তাদের গুণতে হতো পাঁচ টাকা। মূল ফটক দিয়ে পালাতে দারোয়ানের হাতে গুজে দিতে হতো পাঁচ টাকার নোট। পাঁচ টাকা গচ্ছা যাওয়া রবিউল স্যারের অগণিত বেতের বাড়ি আর মেয়েদের সামনে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে ঢের ভাল ছিল বন্ধুদের কাছে। এভাবে নবম শ্রেণির অর্ধবছর ছুটির ঘন্টা বাজার আগেই আমাদের ছুটি হতো।

আমরা পাঁচ বন্ধু প পান্ডব নামে পরিচিত ছিলাম। ক্লাসে সবার আগে আসলেও আমরা পাঁচ বন্ধু বসতাম ক্লাসের সর্ববামের সর্বশেষ বেে । আমি, নিলয়, জনি, উত্তম আর জসিম। বন্ধুদের মধ্যে জনি ছিল বেশ চটপটে আর সাহসী। মূলত জনির বুদ্ধির অণুপ্রেরণায় আমরা স্কুল পালানো সাহস আয়ত্ব করেছিলাম।

স্কুল ড্রেস না আনা, প্রথম ক্লাসে না পড়ে আসা পড়া প ম ক্লাসে পড়ে দেওয়া, প্রতিদিন প্রতিদিন ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পৃষ্টা পৃষ্টা পড়া মুখস্থ করার ভয়ে আমাদেও দেখাদেখি অনেকেই স্কুল পালাতে শুরু করল। আসলে ইংরেজি বই খুললে ইংরেজি বর্ণমালার কিছু সারি ছাড়া আর কিছুই দেখতাম না। এসব পাঠ উদ্ধার করা আমাদের পক্ষে দিনকে দিন অসম্ভব হয়ে উঠে।

 

প ম ক্লাসে প্রতিদিন এভাবে অনুপস্থিতি দেখে রবিউল স্যার পঞ্চম ক্লাসে ফের রোল কল করা শুরু করলেন। যারা সকালে উপস্থিত ছিল কিন্তু প্রঞ্চম ক্লাসে থাকত না তাদের নাম হাজিরা খাতায় লাল কলম দিয়ে গোল করে দিতেন। গোল করাদের নিয়ে তিনিএকটি তালিকা করেছেন। রেডলিস্ট নামক স্কুল পালানোদের এই তালিকা চলে হেডস্যারের টেবিলে। আমাদের কিছু টিকটিকি বন্ধুর কল্যাণে স্কুল পালানোর সমস্ত প্রক্রিয়ার তথ্যও চলে গেল স্যারদের কাছে। ফলে স্কুলে নতুন দারোয়ান আসল।  মেহগনি গাছ কাটা পড়ল, শেয়ালের গর্তও বন্ধ হয়ে গেল। আর আমাদের অগত্য বিকেল চারটার ছুটির ঘন্টার অপেক্ষায় থাকতে হতো।

ফলে কিছুদিনের জন্য টিফিন ছুটিতে স্কুল পালানো কয়েকদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল আমাদের। এদের মধ্যে একজন আছে যাকে কোন ঝড়-ঝ¦ন্ডা জলোচ্ছ্বাস দমিয়ে রাখতে পারেনা। সে হলো জনি।

সেদিন মুশলধাওে বৃষ্টি হচ্ছিল। সবাই কোনরকমে ক্যান্টিনে টিফিন করে ক্লাসে বসে আছে। মাঠে খেলতেও পারেনি। ক্লাসবন্দি আমাদের কারো দৃষ্টি হিজল ফুলের বানের জলা ভাসতে থাকা মালায়, কেউ বা দূরে মাঠে বৃষ্টি ভেজা পথিকের দিকে অপলক চেয়ে থাকে। বন্দি সময়টাতে মেয়েরা ইচিংবিচিং খেলত। আর জনি ভাবত এতকিছুর পরও কীভাবে পালানো যায়।

সেদিন রবিউল স্যার  সবাইকে পাঁচটি সিন ক্লজ পাঁচটি আনসিন ক্লজ পড়ে আসতে বলেছেন। জনি ইংরেজি বই ই  কিনেনি।

এরইমধ্যে সে নিজের বই চারভাগ করে আমাকে  নিলয়কে,জসিম ও উত্তমকে দিয়ে দিছে। এরপর বৃষ্টি মাথায় ভিজতে ভিজতে স্কুল মাঠের উত্তর পাশ হয়ে জনি হারিয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর দেখি রবিউল স্যারের সাইকেলের পেছনে করে স্কুলে ঢুকছে জনি। দুইজনের মাথায় দুইটি পলিথিন।  স্পট এরেস্ট জনিকে সাইকেলের পেছন থেকে আমরা ঘটনা আঁছ করতে পারছিলাম।

স্কুলের একদম পেছনের দেওয়াল টপকিয়ে বিলের মাঝ দিয়ে রাস্তায় উঠতেই রবিউল স্যারের মুখে পড়ে জনি। সাথে সাথেই সাইকেলের পেছনে বেধে নিয়ে আসে তাকে।

জনি ক্লাসে ঢুকার কিছুক্ষণ পর রবিউল স্যার ক্লাসে ঢুকেছে। গায়ের জামা ভেজা। ভেজা চুল মুছছে তবু আদ্র ভেজা। নোয়াখালির মানুষ তার উপর রগচড়া। জনির রাগ সবার উপর যায় কিনা সে ভয়ে পুরা ক্লাস তটস্থ।

ক্লাসে ঢুকেই জনিকে কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে রেখে এক দফা ধোলাই চালালেন। তবে এসবে জনির কোন বিকার নেই।

এক পায়ে তালগাছ দাঁড় করানো  রেখেই স্যার দিনের পড়া শুরু করলেন। পাঁচটা সিন ক্লজ পাঁচটা আনসিন ক্লজ মুখস্থ বলতে হবে।

পড়ার জিজ্ঞেস করার আগে কে কে বই আনে নাই তাদের শাস্তি আগে দিয়ে দেন রবিউল স্যার।  ক্লাসে সংখ্যাগরিষ্টই এই দলের। পড়ে শিখে আসা হাত উঠেছেও পাঁচটি। যে বাড়িতে সন্ধ্যার পর ছেলে পড়তে বসেছে কিনা খোঁজ নেওয়ার অভিপ্রায় থাকে না সেই বাড়ির ছেলের ইংরেজি বই কেনা ছাড়াই বছর শেষ হওয়া স্বাভাবি। বরং  বেতের পেছনে শিক্ষকেরা বাজেটই বৃদ্ধি করে যেত।

আজও রীতিমত পড়া শিখে না আসাদের ১০ বেত, আর বইও যারা আনেনি তাদের ১৫ বেত দিয়ে স্যার প্রথম বে  থেকে মার শুরু করলেন। অন্যান্য দিনের চেয়ে সেদিন জনির কারণে স্যারের রাগের মাত্র বেশী ছিল।

এই মারধরের কোন একসময় জনি গিয়ে তার নির্ধারিত পেছনের বেে  চলে গেল। স্যার বলেছিল নাকি সে চলে গিয়েছিল আমরা খেয়াল করিনি।

মারধরের মাঝসময়ে স্যারের সদ্য কেনা নোকিয়া ১১০০ মডেলের ফোনে বারবার রিং বেজে উঠছে। স্যারের সদ্যকেনা ফোনটি স্যার ফোন কভারের পাশাপাশি একটি পলিথিন দিয়ে মুডে রেখেছেন। বৃষ্টি কেন দেশে বন্যা হলেও ফোনে পানি ঢুকার  কোন সম্ভাবনা নেই।

বারবার কল আসায় সমস্ত নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করে রবিউল স্যার ফোন বের করেন। কিন্তু ফোন বের করে যখন ই রিসিভ করতে যাবেন তখনই কল কেটে যাচ্ছে। যখনই ফোন কয়েকটি কাভার বেষ্টিত করে পকেটে ঢুকাতে যাবেন তখন ফের রিং বেজে উঠে। এক মিনিটি ফোনে কথা বললেই সাত টাকা বিল কেটে যায়। এভাবে কয়েকবার হওয়ার পর সাত টাকার মায়া ছিন্ন করে স্যার ফোন ব্যাক করেন।

ফোন ব্যাক করার সাথে সাথেই ঘটে গেল অবাক কান্ড। পেছন বেে  বসা জনির পকেটে ফোন বাজছে। পুরা ক্লাস তো অবাক। হা করে কতক্ষণ জনির দিকে কতক্ষণ স্যারের দিকে তাকাচ্ছি আমরা।

রাগে তরতরে কাঁপছেন রবিউল স্যার। এইও সম্ভব তার সাথে। সাগরের মাঝ থেকে চিল যেভাবে মাছ তুলে নিয়ে আসে সেভাবে এক লাফে বে  থেকে তুলে নিয়ে আসেন রবিউল স্যার।

স্যার রাগে কথা বলতে পারছেন না। ‘হারামজাদা তোকে আজ  মেরেই ফেলব . …. (মারতে মারতে স্যার কতশত অভিশাপ দিচ্ছিল কান পেতেও কেউ বুঝতে পারল না)

জনির উপর দুইটা বেত শেষ হয়ছে। স্যার অফিসে পাঠিয়েছেন আরও কয়েকটি বেত আনার জন্য। বেত না পেলে যেন বাইরের গাছ থেকে ডাল  ছিঁড়ে আনে।

পরবর্তী দফায় বেত্রাপ্রহারের রবিউল স্যার হালকা জিরিয়ে নিতেই জনি ক্লাস রুম থেকে ভূঁ-দৌড় দিল। স্যারও পেছন পেছন দৌঁড়।

স্যারের দৌঁড়ানি খেয়ে জনি উঠে যায় একদম স্কুলের ছাদে।

জনি এক দৌঁড়ে দ্বিতীয় তলার ছাদে গিয়ে দেখে আর পালানোর পথ নেই। প্রাণ বাঁচাতে একটা রড় ধরে উঠে পড়ে সিড়িঘরের ছাদে উঠে চেষ্টা করে। ঝুলন্ত রড় ধরে সিড়ি ঘরের ছাদে স্যার উঠতে পারবেন না।

ছাদের একদম কিনার গিয়ে জনি ডাক দিচ্ছে ‘স্যার আর এক কদম যদি সামনে আসেন তবে আমি লাফ দিবো। আর এইখান  থেকে লাফ দেই তবে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। আর আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন আপনি!’

জনির এই হুমকিতে  স্যার বিচলিত নন। তিনি আরও শক্তিতে সিড়ি ঘরের ছাদে উঠার চেষ্টা করছেন আর জনিকে নানা হুমকি দিচ্ছেন।

‘হারামজাদা তোকে আমি স্কুল ছাড়া করব, তোর কপালে রেড় টিসি আছে।’

জনি স্যারের বকুনিতে ছাদের একদম কিনার চলে যায়। মনে হয় সত্যিই সত্যিই লাফ দিবে!

ঘটনায় কিংকর্তব্যমিূঢ় ক্লাসের আমরা কয়েকজন ইতিমধ্যে তাদের পেছন চলে আসছি।

এমন সময় ছাদের ছিল্লাছিল্লিতে দশম শ্রেণির ক্লাস থেকে আলী স্যার আসেন। আলী স্যার স্কুলের স্কাউট টিচার। বিকালে মাঠে ছাত্রদের ভলিবল শেখান স্যার। ফলে তিনি ছাত্রদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

আলী স্যার ঘটনা বুঝার পর রবিউল স্যারকে থামানোর চেষ্টা করতে লাগলেন।

ততক্ষণে ঘামে-ভয়ে রবিউল স্যারের জবান আসছে না ঠিকমত। জনির কাছেও যেতে পারছেন না। আবার সত্যি সত্যি জনি লাফ দিবে এই ভয়ও তাঁকে পেয়ে বসে।

রবিউল স্যারকে থামিয়ে আলী স্যার জনিকে ডাক দেয় ‘বাবা এমন করিস না। আমি অনুরোধ করছি। ফিরে আয়।’

অনেক অনুনয় বিনয়ের পর জনি ডাক দিয়ে বলে যদি রবিউল স্যার সবাইকে শুনিয়ে কথা দেন,‘ তিনি আর কাউকে মারবেন না। এক গাদা গাদা পড়া দিবেন না’ তবে আমি নিচে নামব।

পরিস্থিতির কারণে সবার সামনে রবিউল স্যার বললেন, ‘ঠিকাচ্ছে আগে নামতে বলেন।’। কিন্তু আমরা জানি মসিবত কেটে গেলে রবিউল স্যার সব কড়ায় গন্ডায় উসুল করবেন। তবু আলী স্যারের বারবার অনুরোধ আর বাবা ডাকে জনি বিশ্বাস করে নেমে আসে আলী স্যারের কাছে।

জনি আর আলী স্যারকে রেখে আমরা রবিউল স্যারের পেছন হাঁটতে লাগলাম। অফিসে গিয়ে গ্লাসের পর গ্লাস পানি খান স্যার। একজন সাহস করে উচ্চারণ করে,‘ স্যার ক্লাস!’

চরম গ্লানি খুব কষ্টে হাতে ইশারায় না জানিয়ে দিলেন। আর আলী স্যার জনিকে নিয়ে স্কাউটের রুমের দিকে চলে গেলেন।

অজানা আতঙ্ক নিয়ে সেদিনের মতো আমরা বাড়ি ফিরি।

এই ঘটনায় বেশ বড় ধাক্কা লাগল স্কুলে। রবিউল স্যার বেশ নরম হয়ে যান। ছাত্রদের সাথে খুব একটা কথা বলতেন না। ক্লাসেও খুব একটা চাপাচাপি করতেন না। সবাইকে পড়তে বলে আনমনে অন্যদিকে চেয়ে থাকতেন।

অভিভাবক সমাবেশ করে ছাত্রদের হাতে মোবাইল না দেওয়া, বাড়িতে নিয়মিত পড়তে বসা, ক্লাসে বেতের ব্যবহার না করাসহ বেশ কিছু আমূল পরিবর্তন আসে। মাত্রাতিরিক্ত বাড়ির কাজ দেওয়া বন্ধ হয়।একটু দুর্বলদের জন্য সকাল আটটা থেকে বিশেষ কোচিং চালু হয়।

ফলে বিকেল চারটার ছুটির ঘন্টার আগ পর্যন্ত স্কুলে বন্দি থেকে কাটে বাকি স্কুল জীবন। কিন্তু জনির একদম ছুটি হয়ে গেছিল। সে আর স্কুলের গন্ডিতে পা রাখতে পারেনি। একসময় আমাদেরও স্কুলের শেষ ছুটির ঘন্টা বেজে যায় কিন্তু জনির খোঁজ নেওয়া হয়নি কারো।

#…………………………..

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

একটি মন্তব্য

  1. ভাই তো ভাই। অসাধারণ বাস্তবধর্মী গল্পের হাত। কলম চলুক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।