বাংলাদেশের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবসা

()

বর্তমানের এই শূন্য দশকে শিক্ষা এবং চিকিৎসা উন্নতমানের সম্মানজনক বহুমুনাফাভোগী ব্যবসা। বেশিরভাগ সমাজসেবক এবং আমলা-কামলা বর্তমানে ব্যবসা হিসেবে প্রথম পছন্দে শিক্ষা ও চিকিৎসাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে নিয়েছে। এটি এমন একটা ব্যবসা যেখানে অল্প পরিশ্রমে বেশি মূলধন খাটিয়ে আজীবন গ্যারান্টিসহকারে মুনাফা পাওয়া যায়। সেবাকে ব্যবসায়ীক তকমা মেখে দেওয়ার পর এই বাংলাদেশে কি পরিমাণ শিক্ষা এবং চিকিৎসা খাতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে এবং অধিকার অনধিকারে পরিণত হয়েছে তা কল্পনাতীত নয়। শিক্ষা ও চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার বর্তমানে খাতা কলমে রয়েছে বাস্তবে তা নেই। বহুগুণে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতকে প্রাইভেটাইজেশন করা বাংলাদেশের অর্থনীতি চালু করার নতুন কৌশলও হতে পারে কিন্তু এই ব্যবস্থা গরীব মানুষের পক্ষে কখনোই সুখকর নয়। বাঙালি অদ্ভুত জাতি, অবৈধ বিষয়কে বৈধ স্বীকৃতি দিতে তার খুব বেশি সময় লাগে না, এই যেমন শিক্ষা এবং চিকিৎসার অধিকারকে ব্যবসা স্বীকৃতি দেওয়া।

দেশের অলিতে-গলিতে ব্যঙের ছানার মতো গড়ে উঠছে কে.জি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ইত্যাদি। একটি দেশের সরকার অবশ্যই দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসা খাত একা সামাল দিতে পারতেন এমনটাও আশা করার কোন যোক্তিকতা আমাদের কাছে নেই। স্বাধীনতার অনেক বছর যদিও পেরিয়ে গেছে তারপরেও আমাদের শীরদাঁড়া আমরা সোজা করে দাঁড়াতে পারি নি। পাবলিক প্রাইভেট মিলেই একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণএই দুটি খাতকে সচল রাখতে হয় এটা চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু এই পাবলিক এবং প্রাইভেট খাতে শিক্ষা ও চিকিৎসার চিত্র কেমন? সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বলতে যা আছে তা শুধুমাত্র ক্ষমতাবানদের দখলে, দরিদ্র কিংবা মধ্যবিত্তদের এখানে চোখেও দেখেন না কেউ। ঝাঁড়ুদার থেকে শুরু করে এখানকার ওয়ার্ডবয় সবাই উত্কোচ ছাড়া এক কদমও ফেলেন না। তাছাড়া আভ্যন্তরীন বড় কর্তাদের মেডিক্যাল সরন্জাম কেনার সময় জানালার প্রতিটি ১০০০ টাকা মূল্যের পর্দার দাম বিশ লক্ষ টাকা করে কেনার নজির তো অহরহ রয়েছে। মুদ্দাকথা সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা যেখানে প্রসার ঘটার কথা সেখানে সংকোচিত হচ্ছে। দেশের জনসংখ্যা হিসেবে যেহেতু সরকারি চিকিৎসা সেবার অপ্রতুল সেক্ষেত্রে সরকার বেসরকারি অনেক হাসপাতালের অনুমোদন দিয়ে থাকেন এবং সে অনুমোদন নিয়ে সহী ব্যবসায় নেমে পড়েন মালিকপক্ষ। প্রশ্ন হচ্ছে সরকারি তদারক সংস্থা কি সেসব অনুমোদন দেওয়া হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের কোন খোঁজ খবর রাখেন না? প্রাইভেট হাসপাতালের অধঃপতন এমন বাজেভাবে হয়েছে যে, টাকা দিতে না পারায় অনেক হাসপাতাল স্বজনদের লাশ আটকে রেখেছে। সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তারবৃন্দ আবার আশেপাশের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর এজেন্ট হিসেবেও চাকরি করে থাকেন, কোন রোগী আসলে তার রোগ নির্ণয় পরীক্ষার রেফারেন্স দিয়ে । সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র অত্যন্ত ভয়াভয় এবং এই খাতকে বাঁচাতে না পারলে গরীবের জন্য হাসপাতাল মঙ্গল গ্রহ হয়ে দাঁড়াবে।

একটি দেশের সুশিক্ষিত জাতি গঠনে দরকার পড়ে সুশিক্ষার আর সে শিক্ষা এখন পণ্যরূপে দেশে কেনা-বেঁচা হচ্ছে। প্রতিদিন গ্রামে-শহরে শিক্ষিত-মূর্খরায় গড়ে তুলছে শিক্ষা ব্যবসা। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে, ইচ্ছে হলে শিক্ষা দিচ্ছে নাহয় নাই। দরিদ্র থেকে অতি-দরিদ্ররা কেবল এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। তথাকথিত মডার্ণ ও আল্ট্রা মর্ডার্ণরা ছুটছে প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারে দ্বারে। শিক্ষা এখন আর কোন মামুলি ব্যাপার নয়, কোন মেধাবী গরীব চাইলেও উন্নতমানের উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে না এদেশে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ মহাসুখে অধিষ্টানে আছে বর্তমানে আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আঙিনা পরিষ্কার রাখাকে চাকরির মূল অংশ হিসেবে নিয়েছেন নাহয় বেসরকারি শিক্ষকতা করা অনেকটা অসম্ভব তাদের পক্ষে। ডে কেয়ার, চাইল্ড কেয়ার, ফুল ডে স্কুলের নামে সামান্য কে.জি স্কুলগুলো বস্তা বস্তা টাকা নিচ্ছে । বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যস্ত ভর্তি ব্যবসাতে। একবার কাউকে ভর্তি করাতে পারলেই কত নামে বেনামে হিসেবের বাইরে টাকা আদায় করা হবে তা কল্পনাও করা যায় না। বছরে বছরে টিউশন ফির উর্ধগতি তো দেশের জিডিপির চেয়েও বেশি হারে বাড়তে থাকে। এমন ব্যবসায়ী দেখেছেন? যার একমাত্র ব্যবসা শিক্ষা কিংবা চিকিৎসা ! আমার চারপাশে আমি দেখেছি। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বেহেস্তে পরিণত হয়েছে, ইন্টার শেষ করার পর জীবনের শেষ লেখাপড়ায় বসে যান শিক্ষার্থীরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স টেস্টের লেখাপড়া। দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সফলতার মুখ দেখেন না শুধুমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারার বেদনা ভুলতে পারেন না বলে। এ যেনো বিশ্বযুদ্ধ। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য যেখানে এতো যুদ্ধ, আগে থেকেই যেভাবে দাসত্বের প্রতিযোগিতার বাজারে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে একজন শিক্ষার্থীকে তার মন মগজ সারাজীবন সুশিক্ষার চেয়ে উপরে উঠার চিন্তায় বেশি মগ্ন হবে। মজার বিষয় হলো, যারা এক হাজার জনকে টপকিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তাদের দাসত্বও অনিশ্চিত, তাদেরকেও বারংবার চাকরির যুদ্ধে নামতে হয়। এদশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বোধহয় কেউ কোনদিন চিন্তায় করেনি অথবা চিন্তা করেই এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রেখেছে।

যেদেশের শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের মোট বাজেটের পরিমাণ সামরিক খাতের বাজেটের অর্ধেক পরিমাণও হতে পারে না সেদেশে শিক্ষা এবং চিকিৎসাকে ধনী ব্যক্তিদের কাছে বেঁচে দেওয়া হচ্ছে বললে ভুল বলা হয়না। নতুন নতুন বেসরকারী শিক্ষা এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে ঠিকই কিন্তু তাদের তদারকির কি হচ্ছে ? আবার এমন নয়তো, বিদেশী ঋণের কাছে বাধ্যগত দেশেকে বন্ধক দিতে দিতে বিক্রি করে দিচ্ছি ! বেসরকারি শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা না গেলে এবং এগুলোর তদারকি সংস্থাগুলোর দুর্নীতি রোধ করা না গেলে বাংলাদেশকে আরেকবার স্বাধীনতার যুদ্ধে নামতে হবে। একবার স্বাধীনতা অর্জন করে বাঙালি সে স্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি এখনো, সংবিধানের মূল দুটি মৌলিক অধিকার ধনিকদের হাতে চলে যাচ্ছে, সঠিক উদ্যেগ নেওয়া না হলে সাধারণ জনণকে সম্পূর্ণরূপে কিনে নিতে হবে মৌলিক অধিকার দুটি।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

পৃথিবীর পথে গন্তব্যহীন পরিব্রাজক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।