বুদ্ধের মুখনিঃসৃত বাণী : ধম্মপদের যুগ্নগাঁথা

()

ধম্মপদ বুদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। হিন্দু ধর্মে গীতা, খ্রীষ্ট্রান ধর্মে বাইবেল এবং ইসলাম ধর্মে কোরান যেমন গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে নিজ ধর্মের অনুসারীরা মানেন ঠিক তেমনি বুদ্ধ ধর্ম ও দর্শন অনুসারীদের জন্য ধম্মপদ অতীব মূল্যবান। গৌতম বুদ্ধ দুঃখ এবং দুঃখ থেকে মুক্তির পথ বর্ণনা করেছেন, শান্তির বার্তা দিয়েছেন মানবকুলের জন্য। বলা হয়ে থাকে বুদ্ধের মুখনিঃসৃত বাণী হলো ধম্মপদ। পালি সুত্তপিটকের পাঁচটি নিকায় অথবা অংশ; তার পঞ্চমটির নাম খুদ্দক নিকায়। খুদ্দক নিকায় আবার ষোলটি বইয়ের সমষ্টি; তাঁর দ্বিতীয় বইয়ের নাম ধম্মপদ, সুতরাং বলা চলে ধম্মপদ ত্রিপিটকের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এ পর্যন্ত ধম্মপদ পালি, লাটিন, জার্মান, ফরাসী, ডেনমার্ক, ইতালী, রুশ, হিন্দী, সিংহল, চীন, তিব্বতি, নেপাল, বার্মা, সংস্কৃত, বাংলাসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে পাঠক সমাজের ভালোবাসা অর্জন করেছে। কালে কালে ধম্মপদ অনুবাদের মাধ্যমে ভাষা পরিবর্তন করেছে, এর অনেক মর্ম অল্প অল্প পরিবর্তীত হয়ে চলেছে, বুদ্ধের সময়কালের ২৫০০ বছর পর এসে বর্তমানে ধম্মপদের মর্মবাণী অটুট পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। সম্প্রতি বুদ্ধ দর্শন এবং ধর্ম নিয়ে আমার জানার আগ্রহ থেকে বুদ্ধিস্ট এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন থাইপেই, থাইওয়ান থেকে বৌদ্ধ ধর্মীয় কিছু বইয়ের অনুরোধ জানিয়ে ই-মেইল করেছিলাম, তাঁরা অনুরোধ পেয়ে কিছু বই পাঠিয়েছিলো। এগুলো পড়তে গিয়ে শ্রদ্ধেয় ধর্মরক্ষিত ভিক্ষুর বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ থেকে অনূদিত ইংরেজী পাঠ Dhammapada বইটির ইংরেজী গাঁথাগুলো আমার মনে ধরে। বাংলা ভাষাভাষী পন্ডিত-অপন্ডিত-নির্বিশেষ সকলের জন্য কিভাবে ধম্মপদের গাঁথাগুলো বাংলা ভাষায় সুপাঠ্য এবং সুবোধ্য করা যায় তার চিন্তা থেকেই অনুবাদ করেছি , নিশ্চয় বাংলা ভাষার এই সংস্করণ বর্তমানে বেশি সহজবোধ্য। পালি সাহিত্যে ধম্মপদের গুরুত্ব মহান এবং বলাবাহুল্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একসময় এই ধম্মপদ প্রভাব বিস্তার করেছিলো, পরে কালের পরিক্রমায় তা কমে এসেছিলো। বুদ্ধ ধর্মের বা দর্শনের মূল মমার্থ ফুটে উঠেছে ধম্মপদে। বুদ্ধ চর্চাকারী সকলের নিত্য সঙ্গী এবং অবশ্যপাঠ্য হিসেবে ধম্মপদ বর্ণনাহীন সহায়ক। উত্থান-পতন জগতের ধর্ম। পূথিবীর অন্তিম সময় পর্যন্ত ধম্মপদ সমান গুরুত্ববহন করবে এমন মনে করার কারণ নেই, তবে অনুমান করা যায় মানবসভ্যতার আরো বহু বছর ধরে জ্ঞানীগুণী গবেষকদের কাছে এই ধম্মপদ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। বাংলার সাধারণ মানুষের মনে বুদ্ধ দর্শন সম্বন্ধে আগ্রহ তৈরি করতে বুদ্ধরক্ষিত ভিক্ষুর ইংরেজী বইটির একটি অধ্যায় বাংলা অনূদিত সংস্করণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশাব্যক্ত করছি, পর্যায়ক্রমে সকল অধ্যায়গুলোর মর্মানুবাদ ব্লগে প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে এবং পরবর্তীতে বুদ্ধ দর্শনে বিজ্ঞ কোন ব্যক্তি দ্বারা সম্পাদনা করে বই আকারে ছাপানোর ইচ্চে রয়েছে। ইংরেজী পাঠ থেকে বাংলা অনুবাদ করার বিভিন্ন পর্যায়ে আমি শ্রদ্ধেয় ধর্মাধার মহাস্থবির অনূদিত ধম্মপদ এবং শীলভদ্র ভিক্ষু অনূদিত বাংলা পাঠ দুটোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি যার ফলশ্রুতিতে এই অনুবাদ কাজ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে বহুগুণে সহজ হয়েছে। এই অনুবাদকর্ম কোন মৌলিকত্বের দাবী রাখে না শুধুমাত্র সকলের নিকট সমাদৃত হওয়ার প্রত্যাশা করে মাত্র।

১ম অধ্যায়
যুগ্নগাঁথা


মনের রাজ্যে মন অগ্রগামী
অর্থাৎ মন এখানে প্রধান;
সবকিছু মনের দ্বারা গঠিত হয়।
যদি অপবিত্র মন নিয়ে
কেউ কথা বলে কিংবা কাজ করে,
দুঃখ তাকে চক্রাকারে অনুসরণ করে
ষাঁড়ের মতো পেঁছনে ঘুরতে থাকে।


মনের রাজ্যে মন অগ্রগামী
অর্থাৎ মন এখানে প্রধান;
সবকিছু মনের দ্বারা গঠিত হয়।
যদি পবিত্র মন নিয়ে
কেউ কথা বলে কিংবা কাজ করে,
সে সুখে থাকে
ছায়ার মতো সুখ তাঁর পেছন পেছন থাকে।


আমাকে উৎপীড়িত করলো,
তিরষ্কৃত করলো,
পরাজিত করলো,
সর্বস্বান্ত করলো,
যারা সবসময় এরকম চিন্তার আশ্রয়ে থাকেন
তাদের কখনো শত্রুতার উপশম হয় না।


আমাকে উৎপীড়িত করলো,
তিরষ্কৃত করলো,
পরাজিত করলো,
সর্বস্বান্ত করলো,
যারা এরকম চিন্তার আশ্রয়ে থাকে না
তাদের শত্রুতার উপশম হয়।


জগতে শত্রুতা দ্বারা
শত্রুতার নিবৃত্তি হয় না।
মিত্রতার দ্বারা
শত্রুতার নিবৃত্তি হয়।
এটাই জগতের শ্বাশত ধর্ম (১)।


জগতে কেউ কেউ
কখনোই বুঝতে পারে না যে
একদিন অবশ্যই মারা যাবো।
যারা এটা বুঝতে পারে
তাদের কলহ দূর হয়।


প্রবল ঝড় যেমন
দুর্বল বৃক্ষকে উড়িয়ে দেয়,
ঠিক তেমনি
যারা শুধু আনন্দের জন্য বাঁচে,
চিন্তা চেতনায় অসংযত,
অপরিমিত খাদ্যে অভ্যস্ত,
অলস এবং অপচয়কারী,
মার (২) তাদের পরাভূত করে।


প্রবল ঝড় যেমন
শীলাময় পর্বতের কোন ক্ষতি করতে পারে না,
ঠিক তেমনি
যারা মধ্যম পন্থায় জীবন-যাপন করে,
ধৈর্য ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে,
চিন্তা ও খাদ্যকে সংযত রাখে,
বিশ্বাস এবং আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিজেকে গড়ে
মার কখনোই তাকে পরাভূত করতে পারে না।


চরিত্রহীন,
আত্মসংযমহীন,
সত্যবাদিতাহীন ব্যক্তি
অথচ গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করে ভিক্ষু হয়,
সে ভিক্ষুত্ব জীবনের উপযুক্ত নয়।

১০
যে নিজের নৈতিক বিকৃতি পরিষ্কার করেছে,
নিজেকে উৎকৃষ্ট রূপে পড়ে তুলেছে,
আত্মসংযমপূর্ণ এবং সত্যবাদী.
তিনি গেরুয়া বস্ত্রে ভিক্ষু হওয়ার উপযুক্ত।

১১
যারা অসার বস্তুকে সার
এবং
সার বস্তুকে অসার মনে করেন
সেই সব মিথ্যকল্পনাবিলাসীরা
কখনোই সঠিক সার বস্তুর সন্ধান পান না।

১২
যারা সার বস্তুকে সার
এবং
অসার বস্তুকে অসার মনে করেন,
সেই সম্যকসংকল্পের অধিকারী ব্যক্তিরা
প্রকৃত সার বস্তুর সন্ধান পান।

১৩
বৃষ্টি যেমন সহজেই
অপরিপক্ক ঘরে প্রবেশ করে,
তেমনি একটি অস্ফুটিত মনে
বৃষ্টির ন্যায় দুঃখ প্রবেশ করে।

১৪
বৃষ্টি যেমন সহজে
একটি পরিপক্ক ঘরে প্রবেশ করতে পারে না,
তেমনি প্রস্ফুটিত মনে
কখনোই দুঃখ প্রবেশ করতে পারে না।

১৫
পাপাচারী ব্যক্তি
ইহকাল এবং পরকালে কষ্ট পায়;
তার পাপকর্মের অনুশোচনার দরুণ।

১৬
সৎ ব্যক্তি
ইহকালে এবং পরকালে সুখে বসবাস করে;
সৎকর্ম সুখ এনে দেয়।
সমস্ত সৎকর্মের কারণে
আনন্দ-উল্লাস নিত্য সঙ্গী হয়।

১৭
পাপাচারী ব্যক্তি
ইহকালে এবং পরকালে;
দুঃখ ভোগ করে।
যখন বুঝতে পারে
“আমি পাপ কাজ করেছিলাম”
তখন আরো বেশি দুঃখ পায়, অনুশোচনায় ভোগে,
এমনকি চূড়ান্ত শোকের দিনেও।

১৮
সৎ ব্যক্তি
ইহকাল এবং পরকালে
পরমানন্দে থাকে।
“আমি ভালো কাজ করেছিলাম”
এই অনুভূতি যখন জাগে,
আরো বেশি সুখ অনুভূত হয়
যখন সে পরমানন্দের রাজ্যে থাকে।

১৯
যে ব্যক্তি
অধিক জ্ঞানমূলক (ধর্ম) চর্চা করে,
কিন্তু অনুরূপ সঠিক কাজ করে না,
তার কখনো জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে না।
ঠিক রাখাল বালকের ন্যায়
যার শুধু গেরস্থের গরু গণনা করে দিন যায়,
কখনো গরুর মালিক হতে পারে না।

২০
যে স্বল্প জ্ঞান চর্চা করেও,
কুশল শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ করে,
রাগ, দ্বেষ ও মোহ
প্রজ্ঞা দ্বারা পরিত্যাগ করে,
প্রস্ফুটিত মন দ্বারা
জাগতিক মোহে আকৃষ্ট হয়না,
তারা সুখী এবং স্বর্গীয় জীবন-যাপন করে।

পাদঠীকা:

(১) শ্বাশত ধর্ম – ধর্ম হলো প্রকৃতির নিয়ম, অবধারিত আদর্শ, যা সাহায্য ছাড়া তার নিজস্ব গতিতে চলে। ঘৃণা কেবলমাত্র ঘৃণার জন্ম দেয়, কখনোই নিবৃত্তি ঘটায় না।

(২) মার – মার শব্দটির সঠিক প্রয়োগ হলো সহজ কথায়, ধ্বংসকারী, মার চেষ্টা করে ১) মানসিক বিচ্যুতি ঘটাতে; ২) বিষ্ময়কর জগতে প্রবেশ; ৩) মৃত্যু আনতে ( এক নং পয়েন্ট মূলত দুই এবং তিন নং পয়েন্ট পরিপূর্ণ করতে কাজ করে); ৪) মার অর্থে অশুভ শক্তির প্রধান কর্তাও বুঝায় – যা নির্বাণের পথগামী চিত্তকে ভুল পথে পরিচালিত করতে সচেষ্ট হয়ে উঠে, নানা প্রলোভন দেখায়, বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। এক কথায় মার অর্থ খারাপ চিত্ত।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

পৃথিবীর পথে গন্তব্যহীন পরিব্রাজক

৩ টি মন্তব্য

  1. আব্দুর রহিম রানা

    বেশ ভালো অনুবাদয্জ্ঞ।

  2. অ্যাডভোকেট শিরুপন বড়ুয়

    বেশ ভালো হয়েছে।

  3. অশেষ ধন্যবাদ। পাশে থাকবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।