মানুষের জৈবিক ইতিহাস

এটা সত্য যে মানুষ আর পাঁচ দশটা প্রাণীর মতোই এ পৃথিবীতে এসেছিল। শুরুতে সে ছিল অসহায়। প্রকৃতির বৈরিতায় সে ছিল একেবারেই বিপর্যস্ত। প্রকৃতির এই বৈরি পরিবেশেই টিকে থাকার জন্য শুরু করে সংগ্রাম। তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ছলে-বলে কৌশলে সে চেষ্টা করে তার অস্তিত্ব রক্ষার। সে লড়াই চলছে আজও। লড়াই চলছে প্রকৃতির সাথে, পারিপার্শ্বিকের সাথে, এমনকি নিজের সাথে নিজের। সত্যি কথাটা হলো মানুষের ইতিহাস হলো এই লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু সে ইতিহাস সরলরৈখিক নয় বঙ্কিম। এটা হলো মানুষের জৈবিক ইতিহাস। অর্থাৎ মানুষ এখানে শুধু জীবই।

উদাহারণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। যেমন বাঘ। সে তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হরিণকে হত্যা করে। বাঘ যেমন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হরিণকে হত্যা করে। একই সাথে গায়ের জোরে একটা নির্দিষ্ট এলাকার মালিকানাও দাবি করে। এই মালিকানা রক্ষার জন্য স্বগোত্রীয়দের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এমনকি নিজের সন্তানকেও এই মালিকানায় ভাগ দিতে চায় না। এটা হলো পশু আইন। মানুষ নামের প্রাণীটির ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা এরকমই দেখতে পাই।

প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রতিটি জীব নিজেকে পাল্টিয়ে নেয়, নেয় বদলিয়ে। এটা জীবের আরেকটা শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ প্রাণী তার আচরণের পরিবর্তন করতে পারে। যেমন বনের ময়নাকে পোষ মানানো, কথা শেখানো। কথা ময়না আগে বলতো না, যখন সে বনে থাকতো। কথা বলাটা ময়নার অর্জিত বৈশিষ্ট্য। বন্যপশুকে গৃহপালিত পশুতে পরিণত হয়েছে এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে। জীবের এই বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে সফল ও সার্থকভাবে ব্যবহার করেছে যে জীবটি তার নাম ‘মানুষ’।

মানুষ তার ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তৈরি করে আইন, আচার আর সংস্কার। এবং এটা করে তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই। তাই এক সময়ের আইন, আচার আর সংস্কার অন্য সময়ে হয় বে-আইন, অনাচার আর কুসংস্কার। মোট কথা ধর্ম, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদি মানুষ তার প্রয়োজনে তৈরি করেছে এবং প্রয়োজনে আবার সেগুলো ভেঙে ফেলবে।

সহজ কথায় মানুষ সম্পর্কে আমারা মোটামুটি নিন্মোক্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারি :
১. মানুষ আর পাঁচ-দশটা প্রাণীর মতোই জীব।
২. টিকে থাকতে চাওয়াটা তার সহজাত প্রবৃত্তি।
৩. সে তার আচরণের পরিবর্তন করতে পারে।
৪. অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে সে সংঘবদ্ধ থাকবে।

পাঠাগার আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমরা বলতে চাই। যে জরাগ্রস্ত ধ্যানধারণা, পশ্চাদপদ মানসিকতা, সেকেলে সংস্কার, যা আমাদের ক্রমাগত পিছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে উত্তরণ অবশ্যই সম্ভব। আর সেটা সম্ভব মানবীক গুণাবলির দ্বারাই। ক্রমাগত চেষ্টা আর প্রচেষ্টার ফলে এই ঘুণেধরা, বিকলাঙ্গ সমাজ ব্যবস্থাটিকে পাল্টে একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ সৃজন একদিন অবশ্যই সম্ভব হবে। সে দিন অবশ্যই বেশি দূরে নয়।
এমন মানব সমাজ কবেগো সৃজন হবে
যে দিন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।
(লালন সাঁই)
এরকম মানব সমাজ সৃজন করার জন্যই আমাদের পথচলা।

লিখেছেনঃ আবদুস ছাত্তার খান।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার অতিথি লেখক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।