মাসউদ শাফি : কবির শহর

()

প্রাগৈতিহাসিক বালির বৃত্ত, মৃত্তিকায় থরে থরে সাজানো পাহাড়, ইউ আকারে ঘিরে আছে সাগর। তার মাঝখানে মহেশখালি অক্ষরের বিম্বিত এক পুরাণের ভূমি। নাথ ও আদিনাথের বুক জুড়ে আধুনিক নাথনাথিনীর শহর। তার ফাঁকে জোছনা গলে যওয়া দ্যুতির মোজেজায় আলোকিত কস্তুরা ঘাট। তারপর কক্সবাজার ভূমি। বাইবৃক্ষ। প্রাচীন জাদি, বুদ্ধের জ্যোর্তির বলয়। খুরুস্কুল চৌফলণ্ডি গোমাতলী ঈদগাহ, ঈদগড়, গর্জনিয়া, নাইক্ষংছড়ি অপূর্ব সবুজের ভূখণ্ড। সেই বিস্তৃত মৃত্তিকা টেনে ধরে প্রতিটি কাল, অবাক কাল। তারপর মেহের ঘোনা, কালির ছড়া, রামু ঘন বনের টিলা, আলিফ মানে লাঠি, লাঠি মানে গর্জন-ঝাউ বৃক্ষ, বৃক্ষ মানে খুটি, বা মানে ভিটে, তা ছা মিঠাছড়ি নীলা উখিয়া টেকনাফ আর অবাক পৃথিবী। তার আগে গেটওয়ে হারবাং চকরিয়া, মালুমঘাট, ডুলাহাজেরা আবার বঙ্গোপসাগর, আবারও অবারিত আকাশ- ‘যতদূর দৃষ্টি ততদূর উড়িয়েছি মনের ডানা’। আলিফ আল্লাহ। মানুষ-মানুষ। আব্রাহামের লাঠি। র‌্যাঁবোর অক্ষরের রঙ। আমার শিশ্ন। আই মানে লাল, বি মানে সবুজ, সি হলুদ। কবির অক্ষর রঙের বিন্যাসে বিভূষিত। অ মানে অবাক, আ মানে আল্লাহ। শব্দের জিকির, বৃক্ষের জিকির আর সাগরের জিকির চলতে থাকে কবির শহর বঙ্গোপসাগরের তটে, মৈনপাহাড়ের রেশতায়। আ মানে আলাওল, পদ্মাবতী। শ মানে শুক্লা শকুনতলা। পুরাণের আদি আশ্রম। দরিয়ানগর বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা। আর মাসউদ শাফির ঝাকড়া চুল। এই পাগলামী নিয়ে আমরা কক্সবাজারে কবিতা লিখতে এসেছিলাম। আমরা মানে আমার মতো ঘোরলাগা আরও অনেক তরুণ। যারা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে শুরু থেকেই দেখিয়েছিলো বুড়ো আঙুল। আমরা পকেটে কবিতা নিয়ে ঘুরতাম, আমরা মগজে কবিতা নিয়ে ঘুরতাম। আমার চোখের ইশারায়, হাতের ছোঁয়ায় কবিতা নিয়ে দরিয়ানগর বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার এই তীর, মৈনপাহাড়ের এই তট চষে ফেলেছি। আমাদের আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার মত মন সমাজের তখনও তৈরি হয়নি, না এখনও। র‌্যাঁবোর আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার মন যেমন সেই সময়ের প্যারিসের তৈরি হয় নাই ঠিক তার মতো। সভ্যতার এত বয়স হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের সমাজের মানসিক পরিপুষ্টি হল না। পুঁজির অবক্ষয়ের ভেতর আমাদের সমাজের স্বপ্ন ডুবে গেল, তার নাম হলো আধুনিক সভ্যতা। অবক্ষয়, অবক্ষয়। আমরা দরিয়ানগরের তরুণীদের কবিতা শুনাতে চাইতাম। আমাদের তাজা আবেগের সেই কবিতা। বঙ্গোপসাগরীয় তীরের দরিয়ানগরের মেয়েরা তো রাশিয়ার নাতাশা, আখমাতাভা, মারিয়া না তারা কবিতা শুনবে। তারা কবিতা লিখি শুনলে তিন মাইল দূরে চলে যায়। তারা না কবিতা না ধর্মের কথা শুনতে চায়। তার কি চায় কি চায়! সে আমরা বুঝতাম না, এখনও কি বুঝি! আমি মানে তুমি, তুমি মানে আমি। আহা! কবিতা। কবিতা কবিতা করে কেটে গেল কত সময়, কত ঘোর, কত দূর, কত ভাব, অভাব। আমি আলী প্রয়াস, নুপা, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, ফোরকান আহমেদ, কুতুব হিলালী, রহমান মুফিজ, হাসান মুরাদ ছিদ্দিকী, অসীম শর্মা, মাসউদ শাফি, কালাম আজাদ,হাসেম সৈকত, মোতেহারা হক মিতু, নীলা আরও অনেক অনেক তরুণ এ মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না। কি ঘোরে না কাটিয়েছি এই শহরে। বাস্তবতা আমাদের কারও মাথায় খেলেনি, কবি হবো কবি হবো এই ঘোরে কাটিয়েছি পৃথিবীর বারান্দায়। কবি হলে কি হয়, কবি না হলে কি হয় সে কি আমরা জানতাম! আমাদের বেদনা, আমাদের ঘোর একান্তই আমাদের। প্রতিদিনের ঘোরে প্রতিদিন কেটে যেত সমুদ্রের ঢেউ গুনে গুনে। রাত হয়ে যেত। বাড়ি ফেরার তাড়ায় মন ভেসে যেত কোথাও। আমরা ফিরে আসতাম রাতের আন্ধারে। সন্ধ্যার সূর্য ডুবে যেত নগরের গভীরে। তারপর হুট করে নামতো রাত। সাগরের ধমকা বাতাসে তারার বিনিসূতার মালায় দূর গগনে আরেক ঘোরে ডুবে যেতাম। লাবনী পয়েন্ট, উর্মি, ঝাউবনের তলায় আমরা বসে পড়তাম। সাগরের ঢেউ গুনে গুনে বড় হওয়া, বিকশিত হওয়া এই ঘোরের সন্তান মাসউদ শাফি। কবিতার জন্য দিয়ে দিল জীবন। কবিতার জন্য মুক্তো কুড়োতে গিয়ে যে ডুব দিলো আর উঠতে পারেনি; বেহায়া মৃত্যু টেনে নিয়ে গেল তাকে।

মফস্বল শহরে কবিতা লিখে জীবন যাপন করা কত কষ্টের সে আমাদের মত করে কেউ বুঝবে না। মফস্বল শহরের সংকীর্ণ সমাজিক চোখ কবিতার সৃষ্টিশীলতাকে কখনও বুঝতে পারে নাই। তারা স্বার্থের সৃষ্টিশীলতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। অধ্যাপক, কবি, ব্যবসায়ী, মাস্টার, সামন্তীয় মানসিকতায় বেড়ে ওঠা মানুষগুলো এতটা নির্দয় স্বার্থপর তাতে অবাক হয়ে যেতাম আমরা। এই করতে করতে সমাজকে তারা একটা কূপমণ্ডুক শহরে পরিণিত করে ফেলেছে। তাদের ছেলে মেয়েরা এখন মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, সীমান্তের ব্ল্যাকার, নীতিহীন রাজনৈতিক নেতা, সরকারি ঘুষখোর আমলা অফিসার। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা ঢুকে গেছে স্বার্থপরতা নিয়ে। যার কারণে তাদের অজ্ঞান মন, অচেতন মন সৃষ্টিশীলতাকে সহ্য করতে পারে না। তাদের সস্তানদের তারা নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না। সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে যারা বেঈমানি করে, কালের সঙ্গে যারা বেঈমানি করে আর মানুষের কমিন্টমেন্টের সঙ্গে যারা থাকে না, প্রকৃতি তাদেরকে ঠিকই শাস্তি দিয়ে বসে। এখন মানুষ সেই শাস্তির শিকার হচ্ছে। ভেতরের অসুন্দর মনের মানুষেরা কিভাবে সুন্দরকে সহ্য করবে। সেটা আমাদের সমাজের বেলায় যেমন সত্য পৃথিবীর অবক্ষয়ী সমাজ ব্যবস্থার জন্যও তেমনই সত্য। মফস্বলের কবিতা চর্চাকারি অনেক কবি সাহিত্যিকদেরও মনোগঠন হয় না। তারা নিজেদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নজুরুলকে মিলায়। এরা বুঝতে চাই না একজন রবীন্দ্রনাথ বা একজন নজরুল পৃথিবীর পথে মানবজাতির প্রতি কি অসহ্য কমিটমেন্ট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। মফস্বলে বসে দুটো ভালো কবিতা লেখা আর চায়ের দোকানে বসে কবিতার আড্ডা দেওয়া এক জিনিস নয়। সেখান থেকে যদি কবিতার কোনো সৌন্দর্য সৃষ্টি না হয় সে আড্ডা এমনই আড্ডা হয়ে থাকে। আমি মাসউদ শাফি নুপা আলী মুরাদসহ আরও অনেকে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের এমন ব্যবহারের শিকার হয়েছি। আমি অবাক হয়ে যাই যারা কবিতা লেখে, সুকামার বৃত্তির চর্চা করে তারা কিভাবে এমন নৃশংস নিষ্ঠুর হয়। তাদেরও মন কেন তৈরি হয় না। এই বিশাল পৃথিবীকে স্বাগত জানতে পারে না কেন তারাও। বেশির ভাগ পুঁজিবাদি বুর্জোয়া খায়েশের মানুষ পরিবার পরিবার করে নিজেদেরকে আরও বেশি স্বার্থপর করে তোলে।

আমি মনে করি মাসউদ শাফি এই সামাজিক মানসিক বিকারের শিকার। আমরা যারা কবিতা লিখতে এসেছি সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত তারাও এই সামাজিক মানসিক বিকারের শিকার। কবিরা খ্যাতির জন্য পাগল, প্রকাশের জন্য প্রচারের জন্য পাগল কিন্তু তারা বুঝতে চাই না, এই অমরত্বের মোহ তাকে পুঁজিবাদী ভাঁড় বানিয়ে তোলে। নিজের অজান্তে নিজেই মহকালের কাছে ছোট হয়ে পড়ে। সমাজ তো এমনিতেই তা হয়ে রয়েছে। তার মানবিক বিকাশ তো অনেক দূরের ব্যাপার। সেখানে যারা কবিতা লিখে তাদের মানসিক নীচুতা, ছোটত্ব, ইতরামি, নোংরামি আমাদের আহত করেছে, আমাদের নিহত করেছে। মাসউদ শাফি আমার অনুজ বন্ধু কবি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একজন সংবেদনশীল কবি। সমাজকে পরিবর্তন করার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া কর্মীও। মনে এক মুখে এক এমন দ্বিধাদ্বন্ধে ভুগতে থাকা কোনো নাবালাক সমাজকর্মী সে ছিল না। তার রাজনৈতিক মতবাদও স্পষ্ট ছিল। মানুষের জন্য কবিতা। সমাজ পরিবর্তনের জন্য লড়াই। সেই লড়াইয়ের সৈনিককে আমরা হারিয়েছি অকালে। বলবো আমরা তাকে হত্যা করেছি। অনাদরে অবহেলায়। তার ভিন্ন ঘরনার চুল রাখা। অদ্ভুত রকমভাবে চলাফেরা করা, মফস্বলের সুশীলরা কেউ মেনে নিতে পারে নাই। তাদের ইস্ত্রি করে মনে ইস্ত্রি করা পোশাকে এ ছিল বড় বেমানান। এইসব কষ্ট বৈপরিত্য নিয়েও বলতে পারি কক্সবাজার আমাদের কবিতার শহর। মাসউদ শাফির কবিতার শহর। আমাদের বেড় ওঠা এই বিশাল বঙ্গোপসাগরের বুকে। তার ধমকা থীর তাজা বাতাসের নিঃশ্বাস টেনে টেনে। শুধু আমার আফসোস থেকে গেল, আমাদের কবিরা, কক্সবাজারের মানুষেরা এত বড় আকাশ, এত বিশাল বিস্তৃত বেলাভূমি এই সমুদ্র নীলাচাল পাওয়ার পরও মনকে বড় করতে পারে নাই। সমুদ্র থেকে কিছুই শিখতে পারে নাই। প্রকৃতির অভিশাপ বুকে নিয়ে পড়ে থাকে তারা।

মাসউদ শাফি আমার কবিতায় রক্তের বন্ধনে জড়িয়ে থাকা আমার হাতের শিরা। আমার কবিতার পঙক্তির বেদনা, আমার আাহত হৃদয়ের আকুলতা। তোমাকে হারানোর কষ্ট আমি কি করে প্রকাশ করবো কবি। আমি বেকারার। আমি মজনুন। আমি লায়লা। গভীর রাত্রির ঘূর্ণি ঘোরে বয়ে যাওয়া তাজা হাওয়া। সেই আমরা বের হতাম রাত্রি। একদিন রাতে আমাদের পুলিশ তুলে নিয়ে থানার সামনে থেকে ছেড়ে দিয়েছিলো। সেই রাত্রি এত তারা আকাশে উলেছিলো, আহা! সেই তারা হয়ে গেলে তুমি। এখন আমি সমুদ্রে গেলে আহমদ ছফা মাসউদ সাফি মালিক সোবহান এ রকম অসংখ্য তারার পানে আনমনে তাকিয়ে থাকি। কেননা, যতই যা বলি এই শহর কবির শহর। এই শহর তোমার শহর। আর আমার অনন্ত বেদনার ঢেউ।

(৩৫তম জন্মদিনের নিবেদন)

লেখক: মনির ইউসুফ।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার মনির ইউসুফ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।