সত্য ও সুন্দর

()

রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইনের সঙ্গে একটা আলাপচারিতায় বলেছিলেন, “সত্য মানুষের মধ্য দিয়েই উপলব্ধ হয়। ব্যক্তিমনের সক্রিয়তা সত্যকে জানার পথ। বিশ্বপ্রকৃতি মানুষ সাপেক্ষ বলেই তা সত্য এবং সুন্দর। এ জগৎ মানুষেরই জগৎ।”
যদিও রবীন্দ্রনাথের উক্তি জন কিট্‌সের “সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য” উক্তির মতো নয় কিন্তু সেই উক্তিকেই প্রতিষ্ঠিত করে। যেহেতু তাঁর মতে সত্য মানুষ নিরপেক্ষ নয়, সুতরাং “সুন্দরই সত্য” হতে অসুবিধা কোথায়?
কিন্তু কিট্‌স নিজেই তার সেই বিখ্যাত উক্তির যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাননি। আসলে তিনি নিজেই সন্দিহান ছিলেন, “সুন্দর হলেই সত্য হয়ে যাবে?”
ঐ আলাপচারিতায়ই আইনস্টাইন রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি, মানুষ থাক বা না থাক পিথাগোরাসের তত্ত্ব চিরসত্য।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিট্‌স এবং রবীন্দ্রনাথ মানবমনের সাহচর্যেই সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করা যায় ধরে নিয়ে বলতে চেয়েছেন যে বিশ্ব সম্পর্কিত যেকোনও সত্যই মানবিক সত্য।

আমরা পড়েছি যে কোন বচন বা উক্তি সত্য হওয়ার অর্থ হলো তা বাস্তবের অনুরূপ হওয়া। আর সত্যতা হচ্ছে বাস্তব ঘটনা বা বস্তুর সঙ্গে সঙ্গতি বা মিল। সুতরাং আমরা প্রশ্ন করতেই পারি সুন্দর কি সত্য হওয়ার এই শর্তকে ধারণ করে? যে সুন্দর মানুষের কাছে সুন্দর তা কি পিঁপড়ের কাছেও সুন্দর? না, এটা হয় না। একই জিনিস সব মানুষের কাছেও সুন্দর নয়। সুতরাং এটা মেনে নেয়াই যায় সুন্দর মানুষ বা ব্যক্তি সাপেক্ষ।
তাহলে যে সুন্দর সবার কাছে সুন্দর নয়, সে সুন্দর কীভাবে সত্য হয়, চিরসত্য হয়? চিন্তার মধ্যে আন্তবিরোধ থাকলে সেখানে আকৃতিগত সত্যতা থাকতে পারে না। সুন্দর সত্যকে নিশ্চিতভাবে ধারণ করে না। মিথ্যাও সুন্দর হয়। কারও সুন্দর কারও কারও কাছে কুৎসিতও। তবে ওদিকেও ভাবা যায়, মানুষের রক্ত লাল, এই জিনিস আপনার কাছে অসুন্দর লাগতে পারে। কিন্তু মিথ্যা নয়। সত্য সুন্দর ও অসুন্দর দু’টোকেই ধারণ করে।

আপনি আমাকে পড়ছেন, এই ঘটনা কোনভাবেই মিথ্যা নয়। স্থান কাল পাত্র ভেদে সত্য পরিবর্তিত হয় না। এবং সত্য মিথ্যার বিপরীত কিছুও নয়। সত্যের বিপরীত হয় না। আমি এখন লিখছি, এটার বিপরীত ঘটনা অসম্ভব। তবে এটা সত্যিই যে ঘটেনি তা বাক্যে প্রকাশ করা সম্ভব। “আকর্ষণীয় পুরুষ নাজমুল হক সুকৌশলে বাচ্চা মেয়েদেরকে মুক্তচিন্তার দোহাই দিয়ে ব্রেইনওয়াস করে মোটেই বিছানায় নিয়ে যেতেন না। আর বেশিরভাগ সময় মেয়েরা নাজমুলকে নয় নিজেকেই দায়ী করে অনুশোচনায় ভুগতেনও না।” হা হা হা!
এটা যদি না ঘটে থাকে তবে এই বাক্যদু’টো সত্য, এটা বিপরীত ঘটনা নয়। এটা মিথ্যা নয়। সত্যতা বচন বাক্য বা উক্তির উপর আরোপিত হয় যা বাস্তব।

সত্য ধ্রুব। সত্যের কোন হেরফের হয় না। হেরফের হয় সিদ্ধান্তের। আমরা মিথ্যাকে সত্য ধরে বলতে পারি না যে সত্য পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এই যে আমি এতোটা লিখলাম, এটা সত্য।
আপেক্ষিক সত্য বলে কিছু নেই। দু’টো আলাদা ঘটনাকে আপেক্ষিকতা দিয়ে তুলনা করা চলে না। আমি তাকে ভালবাসতাম, এখন বাসি না, দু’টো দুইসময়ের ঘটনা। দু’টোই সত্য। একটার কারণে আর একটা ঘটনা মিথ্যে হয়ে যায় না।
এরিস্টটল স্পষ্ট করেছিলেন, “না কে না বলা সত্য, না কে হ্যাঁ বলা মিথ্যা।”
মানুষের গ্রহণ করার উপর সত্যের সত্যতা নির্ভর করে না। সত্য কখনও মিথ্যায় পরিণত হয় না, মিথ্যা কখনও সত্যে পরিণত হয় না। আপনি ধরে নিয়েছেন বলেই এটি সত্য কিংবা মিথ্যা হয়ে যাবে তা কিছুতেই নয়। যার কখনও পরিবর্তন হয় না সেটাই আসলে সত্য।
আমি লিখলাম এটা সত্য, আমি লিখা বন্ধ করলাম সেটাও সত্য। অর্থাৎ দু’টোই সত্য। এবং সময়ের প্রেক্ষাপটে এসব আপেক্ষিক সত্য নয়। এমনকি মায়া হলেও এটা সত্য, কারণ মায়াতে এটা ঘটেছিল।
আমি লিখছি এটা সত্য, আমি লিখা বন্ধ করব এটাও সত্য। এখানে আপেক্ষিকতা আসতেই পারে না।

তার মানে দাঁড়াল, সত্য চিরন্তন । সত্য মানুষ নিরপেক্ষ। মানুষ নেই, কিছুই নেই কিন্তু সত্য চিরায়ত। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, ছিলেন আইনস্টাইন, আছে চাঁদ আছে নদী এসব সত্য। চিরসত্য। মানুষ নেই ; চাঁদের সৌন্দর্য মিথ্যা হয়ে যেতে পারে, চাঁদ নয়।
সুন্দর ধ্রুব নয় এবং সুন্দর মানুষ সাপেক্ষ। পূর্ণিমার চাঁদ শুধু প্রিয়ার মুখ নয়, কারও কারও কাছে ঝলসানো রুটিও। সৌন্দর্য ব্যক্তিগত। সৌন্দর্যের সঙ্গে সত্য মিথ্যার কোনও সম্পর্ক নেই, অবশ্য মানুষ তার মতো করে সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে এটা অবশ্যই সত্য। তবে কেউ যদি বলে সত্যই সুন্দর তবে আমরা আনন্দিত হতেই পারি। আর কেউ যদি বলে সুন্দরই সত্য তবে মুচকি হাসি দেয়া ছাড়া উপায় কি, বলুন!

জানি না আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করলাম কি না। হয়তো এসময় আপনি অন্যকোনও বাক্য উপভোগ করতেন। সেটা হতো আপনার জন্য সুন্দর কিংবা হয়তো কুৎসিতও।
আফসোস নাই করলেন। সবাই বলবে, সময়ের চেয়েও সত্য বেশি মূল্যবান।
এক ভদ্রমহিলা আমার পিঠ খামচে ধরে বলেছিলেন, “আপনি আসলেই জানোয়ার!”
বাক্যটিতে সৌন্দর্য ছিল! বলার ভঙ্গিতে ছিল মাধুর্য।
বাক্যটিতে কি সত্যও ছিল ? ইস্, সবকথাই বলতে হবে কেন, আপনাকে!

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার দিয়ার্ষি আরাগ

জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০। নেত্রকোনায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।