সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে হবে

বাসে উঠেছেন আর পুরুষের পুরুষাঙ্গ, কনুই, সুউচ্চ ভুঁড়ির স্পর্শ পাননি এরকম নারী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এটা একটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে। এটার শিকার সবচেয়ে বেশি হয় শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী নারীরা। কেননা এদেরই প্রত্যেকদিন লোকাল বাসে চলতে হয়, ধাক্কা খেতে হয়, মহিলা নেওয়া যাবে না, মহিলা ঝামেলা, মহিলা উঠাবেন না বলে শ্লোগানের ধ্বনি শুনতে হয়।
আমার বন্ধুটি সেদিন ভেজা শরীরে কোনোরকমে আমাকে মহিলা সিটে বসিয়েছিলেন। তাতে উঠে পরা লোকটি সারাক্ষণ গদগদ করছিল। কারণ তার উঠতে হয়েছে। কিন্তু তাকে পাশে বসতে বললেও বসেনি, কারণ তার পুরুষাঙ্গের নিয়ন্ত্রয় হয়তো তার কাছে ছিল না! পুরো ঘটনাটা অবজারভেশন করতে হয়েছিল।
কথা তা নয়, কথা হলো এ জীবনে কতবার পুরুষের ঘঁষা খেয়েছি তা বলে শেষ করার মতো অবস্থা নেই। স্তনে, নিতম্বে, যৌনাঙ্গে, বগলে কোথাও বাদ নেই- এটা ধর্ষকামী রাষ্ট্রের ধর্ষকদের সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে। এর সাথে একটা রাষ্ট্রের সংস্কৃতি জড়িত। এটা এত সহজে যাবে না তাও জানি।
নারী মানেই ভোগ্যপণ্য, নারী মানেই ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, খাওয়া যায়, কচলানো যায়, টেপা যায়- এটা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কৃতি। আর সংস্কৃতিকে ধারণ করে এ সমাজের নারী-পুরুষ উভয়ই। এ সমাজের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ধারণ করে এরকম নারী সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।
রাস্তায় বের হলে নারী যেমন টিজিং করে, পুরুষও তেমনি করে। নারীর টিজিং কেমন তা আপনি, আমি জানি- মাইয়া মানুষ হইয়া কেমন পোশাক পরছে, চুলগুলা কেমন, ব্যাডাগর মতো হাটে, এর জন্য ধর্ষণ হয়’ এগুলো কমন ডায়লগ। কারণ এটা এ সমাজের চিন্তা। কারো ব্যক্তিগত চিন্তা নয়। চিন্তার প্রকাশটা হয়তো ব্যক্তি করছে কিন্তু মূল জায়গাটা হলো রাষ্ট্রব্যবস্থা।
যে বা যারা নারীদের মুক্তির জন্য শ্লোগান তোলেন, কোনো একটা বিষয় পেলে ঝাপিয়ে পড়েন তাদের এ রাষ্ট্রের ‘ধর্ষকামী’ চরিত্রটাকে উন্মোচর করতে হবে। আর তার জন্য, সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ-আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ-পুরুষতন্ত্রকে বিরোধিতা করতে হবে। শুধুমাত্র পুরুষতন্ত্রকে বিরোধিতা করে সাময়িক কিছু সাপোর্ট পাওয়া যাবে, ভালো লাগাও তৈরি হবে- কিন্তু তাতে আমূল নারী সমাজের কিছু হবে না।
তার মানে এই না যে, আপনি রাস্তায় প্রতিবাদ করবেন না, রেপিস্টকে ছেড়ে দিবেন, নির্যাতককে ধরবেন না। অবশ্যই এই প্রতিবাদগুলো করতে হবে। কিন্তু কথা একটাই পরিবর্তনের জন্য উপরোক্ত শত্রুদের চিহ্নিত করতে হবে। এদেরকে চিহ্নিত করে এদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রাম গড়ে তোলার মধ্যদিয়েই একমাত্র নারীমুক্তি সম্ভব।
টিশার্ট, দেয়াল লিখন, চিকা মারা, শ্লোগান লেখা, লাথি মারা, পুলিশে দেওয়া, গণপিটুনি দেওয়া এগুলোও প্রতিবাদের অংশ। কিন্তু যেকোনো প্রতিবাদ যদি মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে শেষ পর্যন্ত সে প্রতিবাদ ভ্যালুহীন হয়ে পড়ে। হতাশাগ্রস্ত হতে হয়। হয়তো আর কেউ প্রতিবাদে সামিল হওয়ার মানসিকতা পায় না। কিছু হবে না বলে হতাশার টান দেয়। কিন্তু না, হতাশ হওয়া চলবে না। এসমাজটা একদিন নিপীড়িত, মেহনতি জনতার হবে। যেজন্য যার যার অবস্থান থেকেই মূল শত্রুদের দিকে তীর ছুড়তে হবে। এটা কঠিন পথ। কিন্তু কঠিনেরেই ভালোবাসতে হবে। তা না হলে, নারীমুক্তি মিলবে না। তথাকথিত পেটিবুর্জোয়া আবেগ দিয়ে কোনোকিছুর মুক্তি সম্ভব নয়। হয়তো ব্যক্তি তার আত্মঅহমিকায় ভোগার স্বাদ পাবে। আর এস্বাদে আরো কেউ আক্রান্ত হতে পারে, কিন্তু তাতে কারো কিছু যায় আসে না। তাই আবারও বলছি, সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ-আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ-পুরুষতন্ত্র বিরোধী সঙ্ঘ গড়ে তুলতে হবে।

০৮.০৪.১৯

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার লাবণী মন্ডল

মূলত নারী, প্রাণ, প্রকৃতি, রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করি। কমিউনিস্ট মতাদর্শ ধারণ করি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।