স্রোত

()
  1. চৈত্র মাস। চারদিকে খা খা করছে। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে দলে দলে মানুষ চলে এসেছে গ্রামে। ঢাকায় নাকি ভাইরাসের আক্রমণ হয়েছে। আক্রমণ থেকে বাঁচতে গ্রামমুখি মানুষের ঢল। ক’দিন পর মানুষের পিছ পিছ ভাইরাস গ্রামেও চলে এসেছে। ভাইরাসের ভয়ে গ্রামের মানুষও আর ঘর থেকে বের হয়না।
    রাকিবের বাবা ভ্যান চালক। রাস্তায় মানুষ নেই রাকিবের বাবার ইনকামও নেই। বাবা এখন বাড়ির উঠানের লাউ আর ঝিঙে গাছের যত্ন নেন সকাল-বিকাল। বড় বোন বানুতার সাথে খেলে সময় কাটে রাকিবের । স্কুল বন্ধ দুইজনেরই। রাকিব দ্বিতীয় শ্রেণিতে আর বানুতা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। রাকিবের বন্ধু তমাল আর সে আর একসাথে স্কুলে যায়। স্কুলে রাকিবের আরও অনেক বন্ধু আছে। স্কুল বন্ধ দিয়ে দেওয়ায় রাকিবের ভাল লাগে না।
    রাকিব দুয়ারে বসে তার বাবার লাউ গাছে মাচাং দেওয়া দেখে আর বন্ধুদের কথা ভাবে। তার সব বন্ধুর কথা মনে পড়ে। শুক্কুর কাকার কথা মনে পড়ে। স্কুল ছুটি দিলেই ঝুনঝুনি বাজাতে বাজাতে আইসক্রিম বেঁচে শুক্কুর কাকা। রাকিব বাবাকে বলেছে বড় বাজার থেকে তাকে যেন শুক্কুর কাকার মতো একটা ঝুনঝুনি কিনে দেয়। স্কুল থেকে একটি গাছের চারা দিয়েছে রাকিবকে। প্রতিদিন রাকিব সে গাছে পানি দেয়। তার চারা গাছ দেখতে রোজ বিকালে তমাল আসত। ইদানিং সেও আসে না।
    প্রচন্ড খরতাপ শেষে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি বইছে। মসজিদের মাইকে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতার কথা বলা হচ্ছে বারবার। রাকিবদের বাড়ির সামনেই খালে গোড়া (সুইচ গেইট)। ভাইরাসের ভয়ে স্লাইকোন সেন্টারে যাবে যাবে বলেও যায়নি রাকিবের বাবা। হঠাৎ খবর এল গোড়া ভেঙে গেছে। কথা কানে না আসতেই বাড়ির উঠানে হাঁটু পানি। একটা ছোট চাউলের বস্তা আর কিছু মুড়ি মোলা নিয়ে রাকিবদের পরিবারের সবাই তড়িঘড়ি করে কোনরকম বের হয়ে আসে। বাবার কাঁধে রাকিব। মায়ের মাথায় চাউলের বস্তা । রাস্তায়ও হাঁটু পানি। বাতাসের বেগে আগানো যায় না।
    পানির স্রোতে কোনটা বিল কোনটা রাস্তা কিছুই বুঝা যায় না। হঠাৎ পা পিছলে রাস্তা থেকে পানির স্রোতে পড়ে যায় রাকিবের দাদি। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই স্রোত টেনে বিলে নিয়ে গেছে রাকিবের দাদিকে। একটি ভেসে থাকা একটা গাছের ঘুঁটি ধরে কোনরকম ভেসে আছেন। রাকিবের বাবা পানিতে লাফ দিয়ে জীবন বাঁচান তার জীবনদাত্রীর। সবাই ভয়ে, খুশিতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। এ কি জীবন। চোখের পলকেই হারিয়ে যেতে চায় যে জীবন।

এই বিপদসংকুল রাস্তা পার হয়ে তারা যখন সাইক্লোন শেল্টারে পৌঁছেছে তখন সেখানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অনেক ঠাসাঠাসির পর রাকিবরা কোনরকম একটু জায়গা পেল। সাইক্লোন শেল্টারে বারবার মাইকিং করা হচ্ছে সামাজিক দুরত্বে থাকতে। দ্বিতীয়বার জীবন পাওয়া রাকিবের দাদি এমন ঘূর্ণিঝড় সে তার জনমে দেখেনি। জীবন ফিরে পেলেও শশুরের ভিটে হয়ত তারা আর ফিরে পাবে না। সাইক্লোন শেল্টারে আগন্তুক মানুষদের দিকে বিস্ময়ে থাকিয়ে থাকতে থাকতে রাকিব একসময় একটি বেঞ্চির উপর ঘুমিয়ে পড়েছে।
সকালে পায়ে পানির ছোঁয়ায় রাকিবের ঘুম ভাঙে। ঝড় থেমে গেছে। সাইক্লোন শেল্টারেও মানুষ কমে গেছে। গতরাতে দেখা অনেককে দেখা যাচ্ছে না। রাকিবের বাবা একটা ট্রলার ভাড়া করে এনেছে। তার তিন পুরুষের ভিটের কোন চিহ্ন নেই যেখানে তারা ফিরে যেতে পারবে। পানির স্রোতে বিল ভিটে নদী সব একাকার। কোথায় তাদের বাড়ি তার নিশানা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তিন পুরুষের ভিটে একরাত এক ঝড়ে এক নিমিষেই মুছে গেছে।
নাড়ি ছেড়া মানুষগুলোর গন্তব্য ট্রলারে করে কোনমতে বড় সড়কের পাড়ে উঠা। সেখান থেকে নতুন ভিটে নতুন দেশের খোঁজ করবে।
একে একে সবাই ট্রলারে উঠে পড়েছে। রাকিবও। হঠাৎ তার মনে পড়ে স্কুলের কথা, তমালের কথা, শুক্কুর কাকার কথা। তার বাড়ির লাউ গাছের কথা, তার চারা গাছের কথা, স্কুলের হিজল গাছের কথা। উৎকন্ঠায় বাবাকে জিজ্ঞেস করে ‘বাবা আমরা কোথায় যাচ্ছি!’
রাকিবের বাবার কাছে এই প্রশ্নের জবাব নেই। শুধু জানে পানির স্রোত থেমে গেলেও এবার জীবনের স্রোত পাড়ি দিতে হবে।। পানির স্রোত সব নিয়ে গেলেও জীবনের স্রোত কোথাও না কোথাও একটা ঠাঁয় করে দিবে। এই আশায় দূর নিশানায় চোখ রাখে মানুষ।
#………………………..
লেখক: মাস্টার্স অধ্যয়নরত, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।