হিরো আলম, টিকটিক অপু ও আমাদের সাংস্কৃতিক দৈউলিয়াত্ব

()

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে আমাদের দেশে বেশ মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। চলতি দশকের শুরু থেকে ফেসবুকের মাত্রাতিরিক্ত জনপ্রিয়তা সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে একটা প্রভাব রেখে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সিলেটের শিশু রাজন হত্যা, বরগুনার রিফাত হত্যাসহ বহু অপরাধের বিরুদ্ধে ভার্চুয়াল আন্দোলন তুলেছে। বিপরীত অন্ধকার চিত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দু মন্দিরে হামলা ও রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা হয়েছে ফেসবুকের গুজবের কারণে।

তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠেছে বিনোদনের অন্যতম খোরাক। বর্তমানে সিনেমা হল ও টিভি নাটকের জায়গা দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন ওয়েব পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল। যেহেতু খুব সহজেই ইউটিউব ও ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করা যায় ফলে প্রায় সব শ্রেণির মানুষ এখানে নিজেদের বিনোদনমূলক ভিডিও পোস্ট করছে। তবে সব ভিডিও সবার জন্য বিনোদন নয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক শ্রেণির মতো সাংস্কৃতিক শ্রেণিও রয়েছে। গ্রামের বা নিম্নবিত্ত মানুষের বিনোদনের খোরাক যোগানো ভিডিও শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির কাছে ট্রলের বিষয়।

আমরা বগুড়ার আশরাফুল আলম নামের যে ব্যক্তিটিকে হিরো আলম নামে চিনি তাকে মূলত ট্রলের মাধ্যমে চিনি। চিকনা গঠনের কালো, গ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা কোন লোক হিরো হবে এটা আমাদের শহুরে ও শিক্ষিত শ্রেণির কাছে ট্রলের বিষয়। অর্থনৈতিক অবস্থান সাংস্কৃতিক পছন্দও ঠিক করে দেয়। হিরো আলম শহুরে শ্রেণির হিরো না হলেও গ্রামের ও দেশের নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে সে হিরো। ডিশ ব্যবসায়ী হিরো আলমের সিডি ক্যাসেট দেখে বিনোদন পাওয়া সাংস্কৃতিক শ্রেণির ব্যাপারে শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণি কিঞ্চিৎই অবগত। আমাদের শহুরকেন্দ্রিত যে সাংস্কৃতিক আয়োজন তাও কোনভাবে সে শ্রেণির কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

এবার আসি কথিত অপু ভাইয়ের আলাপে। টিকটিক ও লাইকি নামে দুইটি এপসে ১৫-২০ সেকেন্ডের এক ধরনের ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয় হয়েছে অপু নামে এক কিশোর। ছেলেটির জনপ্রিয়তাকে জনআলোচনায় তৈরী করেছে কিছু ইউটিউবার। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই ইউটিউবাররা অপুর চুল, তার হাসি, উচ্চারণ এসব নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিচ্ছে। তারা বুঝাতে চায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা শুধু শহুরে শ্রেণি ডিজার্ভ করে। নাপিতের দোকানের কর্মচারি অপুর কীভাবে মিলিয়ন ফলোয়ার থাকে! তাই হিরো আলম, অপুরা হচ্ছে তাদের কাছে ট্রল। এছাড়া রিপন্দা নামে গ্রামের যে লোকটির ছন্দ ভিডিও ভাইরাল হয় তাকেও তো তাচ্ছিল্য করে ভাইরাল করা হয়। এসব না হয় পাবলিক পরিসর। কিন্তু সামাজিক নিম্ন শ্রেণির মানুষের ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারও নিয়েও ট্রল করা হয়।
ওমান প্রবাসী একজন শ্রমিক তার ফেসবুক আইডির নাম দিয়েছিল,‘ আমি নোমান থাকি ওমান’। তার আইডির স্ক্রিনশট নিয়ে নাম নিয়ে ট্রল করা হলো। যারা ট্রল করেছে তারা সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শহুরে শ্রেণির অংশ। তারা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাদের মতো শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির জন্য। যাদের স্টাটাস ও ছবি আপলোডে বেশ ব্যক্তিত্ব থাকে।।

এবার আলোচনায় আসা যাক টিকটিক লাইকির অপুরা কীভাবে লাখ ছাড়িয়ে কোটি লোকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। মাত্র ১৫-২০ সেকেন্ডের বিনোদনমূলক ভিডিও তৈরী করে এরা জনপ্রিয় হয়। আরও আশঙ্কার ব্যাপার এখানে বেশীরভাগ ভিডিও আপত্তিকর। কিন্তু সমাজের বড় একটি অংশ এসব দেখছে, পছন্দ করছে। এটার কারণ সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চর্চা আমাদের নেই। মায়েরা এখন ঘুম পাড়ানি গান করে না, দাদিরা সোনায় না রহস্যপুরের গল্প। পুথিঁ শুনে কেউ আর চোখ ভেজায় না। শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির বাইরের যে বড় একটি সমাজ রয়েছে সেখানে এই সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরী হয়ে আছে। আর সে শূন্যতায় জায়গা করে নিচ্ছে অপু আর হিরো আলমরা।

অপুদের সমালোচনাকারীদের অন্যতম অভিযোগ তারা রাস্তা বন্ধ করে শ্যুটিং করছে, আপত্তির ভিডিও বানাচ্ছে। কিন্তু শহুরে ইউটিউবারদের আলোচনাটা আমরা আনি না। ইউটিউবে যারা ফানি ভিডিও করে, প্রাংক ভিডিওয়ের নামে রাস্তাঘাটে মানুষকে বিব্রত করে আর সারাদিন নিজেদের চেহারা দেখিয়ে ব্যক্তিগত ব্লগ করে তাদের নিয়ে আপত্তি উঠছে না। তারাও অনলাইনে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষদাগার করে। হুমকি ধামকি , বাইক শোডাউন করে। রাস্তা বন্ধ করে শ্যুটিং করে। তবে এদের সামাজিক শ্রেণি অপু, আলমদের উপরে। ফলে সমাজের উচু শ্রেণির অপরাধ আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।
ইউটিউবে সারাদিন নিজের চেহারা দেখিয়ে ব্লক করা তরুণরা তাদের ভিডিওতে প্রায়শই বলে, ‘আমরা ই্য়াং জেনারেশনের জন্য করছি, দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি, আমার ফলোয়ারদের করছি।’ তাদের এসব দাবিকে স্বাভাবিক চোখে দেখা আর শুধু অপুদের অপরাধী হিসাবে ভাবা বৈষম্যমূলক যে সমাজকে আমরা মগজে মস্তিষ্কে ধারণ করে আছি তারই প্রতিফলন।

অপুরা টিকটিক কেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং তৈরী করছে। শহরেও ইউটিউবের লাইক কমেন্ট সাবস্কাইবের রঙিন জীবনে মোহিত হয়ে অনেক তরুণ পড়াশোনা বাদ দিয়ে ডিএসএলআর নিয়ে সারাদিন ব্লগ আর শ্যুটিংয়ে মেতে থাকছে। এদের মধ্যে যারা ভাইরাল হতে পারে না তারা একসময় হতাশ হয়ে পড়ে। ততদিনে শেষ হয়ে যায় জীবনের +অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়। অপুরা যা করছে তার সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চর্চা নয়। কিন্তু কিছু কিছু ইউটিবাবের এসব সস্তা ফানি ভিডিও কি সঠিক সাংস্কৃতিক চর্চা! বর্তমানে ইউটিউব বা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার জন্য তরুণরা যা করছে তা সত্যিই বিপদজনক। এছাড়া জামা ও গেঞ্জির গায়ে অধুনা আকাঁ বেশীর ভাগই ছবিই বাঙালির সংস্কৃতি নয়। পাবজি খেলার নামে তরুণদের বড় একটি অংশ দিনের বেশীর ভাগ সময় স্মার্ট ফোনে ব্যয় করছে। গ্রামের অপু, হিরো আলম বা রিপন্দাকে ট্রল করা শহরের অধিবাসীরা কি জানে তাদের প্রদীপের নিচে কতটা অন্ধকার হয়ে আছে!

একটি মঞ্চ নাটক দর্শকের দর্শন বদলে দিতে পারে। কিন্তু মঞ্চনাটক দেখতে দর্শক নেই। ইউটিউবের ফানি ভিডিও, ব্যক্তিগত ব্লগে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হচ্ছে। এটা কি আমাদের সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক পরিবেশ নির্মাণ ও চর্চার ব্যর্থতা নাকি ঠিক সংস্কৃতির গোঁড়ায় ই আমরা পৌঁছতে পারিনি সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সমাজবিজ্ঞানীদের।
#……………………………………………….

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।