বিএনপির রাজনীতি ও গতিবিধি

()

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পার করে ৪২ বছরে পা দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রথম দল হিসাবে ৪২ বছর কম সময় না। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপিকে যে সমালোচনা শুনতে হয় তা হলো, ‘ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া দল।’ এর বিপরীতি বিএনপির খুব শক্তিশালী জবাব না থাকলেও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা’ উপাধি দিয়ে নিজেদের গণতন্ত্রের পক্ষের দল হিসাবে উপাস্থাপন করতে চায় বিএনপির নীতিনির্ধারকতরা।

বিএনপি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের সূচনা করে জনপ্রিয়তা পেলেও বিএনপি রাজনৈতিক গতিবিধি নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য অভিযুক্ত দল জামায়াতকে দীর্ঘ সময় ধরে জোটে রাখা নিয়ে দেশ বিদেশে সমালোচনা ও প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে বিএনপিকে। স্বাধীনতার পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে যখন জাতিতাত্ত্বিক পরিচয় হিসাবে দাঁড় করানো হচ্ছিল তার বিপরীতে জিয়াউর রহমান ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ’কে বাংলাদেশের মানুষের জাতিতাত্ত্বিক পরিচয় হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। তবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের বিতর্ক শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ নিয়ে পক্ষ বিপক্ষের দর্শন জড়িত। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সমর্থকরা ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদকে মনে করেন পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি পশ্চিমাংশের আধিপত্য জারি রাখার কৌশল। তবে বিএনপি এই ইস্যুতে জনপ্রিয়তা পেলেও এর বুদ্ধিভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরী করতে বিএনপির অগ্রগতি খুবই যৎসামান্য।

বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসাবে বর্তমান সময়ে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। টানা ১৪ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে। বর্তমান সংসদে যে পাঁচজন সদস্য বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করছে তা নিয়েও বিএনপির ঘরে বাইরে নানা অসন্তোষ, বিতর্ক রয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন দীর্ঘদিন কারাভোগের পর বর্তমানে সরকারের বিশেষ সুপারিশে মুক্তি পেয়ে একপ্রকার স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি আছেন। ২০০৮ সালের আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আড়াই বছরের মাথায় বিএনপি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলে। কিন্তু আন্দোলনের ফসল কখনো ঘরে তুলতে পারেনি। হরতাল অবরোধের মতো লাগাতার কর্মসূচির ফলে একসময় বিএনপির সমর্থকরাও বিএনপির প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠে। এছাড়া নিয়মতান্ত্রিক নানা আন্দোলনে বিএনপির সমন্বয়হীণতা সর্বমহলে আলোচিত। বিএনপির আন্দোলন মানেই ক্ষমতা গ্রহণের ইস্যু। জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে শুধুমাত্র বিবৃতি দিয়ে দায় সেরেছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে।

বিএনপির সর্বশেষ ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলা বিশ^ রাজনীতিতে বড় ধরনের একটি পরিবর্তন নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির সে পরিবর্তন আঁচ করতে না পারার সমালোচনা রয়েছে বিএনপির। তবে সাম্প্রতিক দশকে বিএনপির আন্দোলনের পাশাপাশি বিরোধী দল হিসাবে আন্তজার্তিক মিত্রদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যর্থতা রয়েছে। ২০১২ সালে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে ভারত সফরে গেলে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনাসহ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। তিনি এই সফরে ভারতের রাষ্ট্রপতি, বিরোধী দলের নেতা, কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধির সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু তার ২ বছরের মাথায় ভারতের ইতিহাসে একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সাথে ঢাকায় নির্ধারিত বৈঠক জামায়াতের হরতালের দোহায় দিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বাতিল করা হয়। বিএনপি এহেন অকূটনৈতিক আচরণ ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বিএনপির প্রতি নীতিবাচক মনোভাবকে সূদৃঢ় করে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে গণচীনের সাথে বিএনপির সুমিত্রতা রয়েছে। ২০১২ সালে ভারত সফরের আগে বিএনপি নেত্রী চীন সফরেও বেশ অভ্যর্থনা পান। কিন্তু ব্রিকস, সাংহাই কর্পোরেশন ও বিআরই কেন্দ্রিক বিশ^ রাজনীতির যে মেরুকরণ তাকে নিজের করতে পারেনি বিএনপি। ২০১৪ সালে আওয়ামীলীগ সরকার টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণ করলে ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রসমূহ আওয়ামীলীগকে ঐক্যবদ্ধ সমর্থন জানায়। ক্ষমতার বাইরে দীর্ঘ ১৪ বছরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিএনপির সমন্বয়হীনতা ও আন্তজার্তিক রাজনীতির মেরুকরণে নিজেদের অবস্থান তৈরী করতে না পারার বিএনপির দশকের বড় ব্যর্থতা বলা চলে। তবে এই সময়ে বিএনপির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো দল হিসাবে এখনো ভাঙনের মুখে না পড়া।

বর্তমান সময়ে বিএনপিকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিএনপি কী জামায়াযুক্ত ২০ দলকে চাঙা করবে নাকি ঐক্যফ্রন্ট কেন্দ্রিক নিজেদের রাজনীতির গতিপথ ঠিক করবে। পরবর্তীতে স্থায়ী কমিটিতে বিস্তারিত আলোচনা করবেন বলে বেগম খালেদা জিয়া নিজ সিদ্ধান্তে জামায়াতকে বিএনপির সাথে জোটে এনেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে দেশ বিদেশের নানা চাপের মুখে বিএনপি জামায়াতের সাথে জোট সঙ্গ ত্যাগ করেনি। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানের প্রাক্কালে বিএনপি জামায়াত ইস্যুতে কোন স্পষ্ট বিবৃতি দেয়নি। এমনকি বিএনপি জামায়াত ছাড়লে নোবেল জয়ী ড. ইউনূস বিএনপিতে যোগ দেওয়ার যে আলোচনা উঠেছিল তাও আলোচনা পর্যন্ত রয়ে যায়। বিএনপি জামায়াত জোটের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেষে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি মধ্যবামপন্থি কিছু দল নিয়ে নতুন জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। তৎকালীন সময়ে বিএনপি জামায়াত ছাড়ছে বলে আলোচনা আসলেও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনবিহীন জামায়াতকে ২৫ আসন ছেড়ে দিয়ে বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট শরীকদের হতাশ করে। বেগম খালেদা জিয়া সরকারের বিশেষ বিবেচনায় যে ৬ মাসের জামিন পেয়েছেন তার মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। ঐক্যফ্রন্ট যখন গঠন হচ্ছিল তখন তিনি জেলে। এখন প্রশ্ন আসছে তিনি ঐক্যফ্রন্ট নাকি জামায়াতসহ ২০ দল কোনটাকে নিয়ে রাজনীতি করার সবুজ সংকেত দিবেন দলকে। ২০ দল আগের সে ২০ দল নেই। জোটভুক্ত জামায়াতকে নিয়ে ১৯৭১ এর বিতর্ক ছাড়াও জামায়াতের নিবন্ধন নেই। ইসলামী ঐক্যজাটের বড় অংশ জোট ত্যাগ করেছে, আন্দালিব রহমানের বিজেপিও জোটে নেই। অলি আহমেদের এলডিপিও আর জোটকে আপন মনে করছে না। ফলে জোটবদ্ধ রাজনীতি নিয়ে বিএনপিকে নতুন করে ভাবার সময়ে এসেছে।

তবে বিএনপির বর্তমান সময়ে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষিতে হতে যাওয়া বিশ^ রাজনীতির মেরুকরণ ধরতে পারা। বিশ^ রাজনীতিতে একটা ভূমিধ্বস পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। সম্ভাব্য অক্ষ তৈরীর মাঝখানে বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় ও নিরপক্ষে দেশ হিসাবে নিজের অবস্থানে থাকার চেষ্টায় রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধী দল হিসাবে বিশ^ রাজনীতির প্রেক্ষাপট আঁচ করতে পারার কূটনৈতিক বিচক্ষণতা দেখাতে না পারলে বিএনপিকে বিবৃতি নির্ভর দল হিসাবে কাটাতে হবে আরও দীর্ঘ সময়৷

#…………..

[email protected]

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ব্লগপোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: আমার কলম কপিরাইট আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল সুতরাং লেখা কপি করাকে নিরুৎসাহিত করে। লেখার নিচে শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।